, ২ কার্তিক ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

হিজরি নববর্ষ ও মহররম মাসের গুরুত্ব

  ধর্ম ডেস্ক

  প্রকাশ : 

হিজরি নববর্ষ ও মহররম মাসের গুরুত্ব

বিশ্বময় মহামারি করোনার মধ্যেই আমরা আরবি নতুন বছরে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। আমাদের প্রার্থনা থাকবে দয়াময় আল্লাহ যেন বিশ্বকে করোনামুক্ত করেন। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর সংস্কৃতিতে ও মুসলমানদের জীবনে হিজরি সনের গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ হিজরি সন কবে আসে কবে যায়, তা হয়তো আমাদের অনেকেরই জানা থাকে না।

ইসলামি আরবি বর্ষপঞ্জিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের পুণ্যময় স্মৃতি। তাই যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের কাছে হিজরি সাল অনেক গুরুত্ব বহন করে আসছে। আল্লাহ তাআলার অপার কৃপায় আমরা ১৪৪৩ হিজরি বর্ষে প্রবেশ করার তাওফিক লাভ করেছি, আলহামদুলিল্লাহ।

মুসলমানদের রোজা, হজ, ঈদ, কুরবানিসহ ইসলামের বিভিন্ন বিধি-বিধান হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমান যুগে তা কেবল রমজান ও ঈদের হিসাব রাখার মধ্যেই যেন সীমিত। আমাদের সন্তানদের বেশির ভাগই তা জানে না যে- হিজরি সাল কী আর আরবি মাসগুলোর নামই বা কী?
হিজরি সনের আরবি মাসগুলো- মহররম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জুমাদাল উলা (জমাদিউল আউয়াল), জুমাদাল উখরা (জমাদিউস সানি), রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হিজরি সনের শুভ সূচনা হয়। ইসলামি সন তথা হিজরি সন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের ঐতিহাসিক তাৎপর্যময় ঘটনার অবিস্মরণীয় স্মারক।

আল্লামা শিবলি নোমানি রহমতুল্লাহ আলাইহি সুপ্রসিদ্ধ আল ফারূক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে ১৬ হিজরি সনের শাবান মাসে খলিফার কাছে একটি দাপ্তরিক পত্রের খসড়া পেশ করা হয়, পত্রটিতে মাসের উল্লেখ ছিল; সনের উল্লেখ ছিল না। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন খলিফা বললেন, পরবর্তী কোনো সময়ে তা কীভাবে বোঝা যাবে যে এটি কোন সনে পেশ করা হয়েছিল?

অতঃপর তিনি সাহাবায়ে কেরাম ও অন্যান্য শীর্ষ পর্যায়ের জ্ঞানী-গুণীদের পরামর্শে হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জুমাদাল উলা মুতাবিক ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে হিজরি সন প্রবর্তনের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

হিজরতের বছর থেকে সন গণনার পরামর্শ দেন হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু। পবিত্র মহররম মাস থেকে ইসলামি বর্ষ শুরু করার পরামর্শ প্রদান করেন হজরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। (বুখারি ও আবু দাউদ)

বর্ষগণনার ক্ষেত্রে হিজরতের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ কী? অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত প্রাপ্তিসহ আরো একাধিক বিষয়কে কেন্দ্র করে সন গণনা শুরু করা যেত। এ প্রশ্নের উত্তর আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানি (রহ.) এভাবে দিয়েছেন, সুহাইলি (রহ.) এ বিষয়ে রহস্য উন্মোচন করেছেন। তিনি বলেছেন, সাহাবায়ে কেরাম সন গণনার বিষয়ে সুরা তওবার ১০৮ নম্বর আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে হিজরতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সেখানে প্রথম দিন থেকে তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত মসজিদে নামাজ আদায় করতে বলা হয়েছে। এই ‘প্রথম দিন’ ব্যাপক নয়। এটি রহস্যাবৃত। এটি সেই দিন, যেদিন ইসলামের বিশ্বজয়ের সূচনা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিরাপদে, নির্ভয়ে নিজ প্রভুর ইবাদত করেছেন। মসজিদে কোবার ভিত্তি স্থাপন করেছেন। ফলে সন গণনার ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম সেই দিনকেই বেঁচে নিয়েছেন। (ফতহুল বারি)

হিজরি সনের প্রথম মাস মুহররম
হিজরি বছরের প্রত্যেকটি মাসেরই রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। ইসলামে এ মাসের অনেক গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। মুহাররম মাস শুধুমাত্র কারবালার ঘটনা স্মরণ করার মাস নয় বরং মুসলিম বিশ্বকে নতুন করে গড়ে তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞার মাস।

মহররম শব্দের অর্থ সম্মানিত। ইসলামের ইতিহাসে এই মাসটি এমন কতগুলো উল্লেখযোগ্য স্মৃতিবিজড়িত; যে স্মৃতিসমূহের সম্মানার্থেই এই মাসকে মহররম বা সম্মানিত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাইতো এ মাসের ৯, ১০ অথবা ১০, ১১ তারিখে ২টি রোজা রাখা উত্তম। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
হজরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রোজা রাখার জন্য এত অধিক আগ্রহী হতে দেখিনি যত দেখেছি এই আশুরার দিন এবং রমজান মাসের রোজার প্রতি।’ (বুখারি)

সুতরাং হিজরি নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা- বিশ্ববাসীর জন্য নতুন বছর ১৪৪৩ হিজরি বয়ে আনবে শান্তি, নিরাপত্তা আর দূর হবে মহামারি করোনা এবং বন্ধ হবে ধর্মের নামে রক্তপাত।

  • সর্বশেষ - অতিথি কলাম