, ২ কার্তিক ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

শোক দিবসে চার বীর মুক্তিযোদ্ধার অনুভূতি

  ফিচার ডেস্ক

  প্রকাশ : 

শোক দিবসে চার বীর মুক্তিযোদ্ধার অনুভূতি

১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যরা। সেদিন দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশে অস্থিরতা বিরাজ করে। সারাদেশ শোকে বিহ্বল হয়ে পড়ে। বীর মুক্তিযোদ্ধারাও দিশেহারা হয়ে পড়েন। এখনও বঙ্গবন্ধু হত্যার শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি অনেক মুক্তিযোদ্ধা। তেমন কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার অনুভূতি জানতে আজ মুখোমুখি হয়

সোনাতলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকাল ৭টার খবরে যখন শোনা গেল যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আততায়ীর গুলিতে নিহত। তখন আমরা খবরটা শুনেই মর্মাহত হই। এককথায় বলা যায়, দিশেহারা হয়ে গেলাম। কী হয়ে গেল এটা! আমাদের অভিভাবক চলে গেলেন। আমাদের কী হবে? আমরা মুক্তিযোদ্ধারা খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম, আমাদের অভিভাবককে হত্যা করা হলো, এখন আমাদের কী হবে? শুধু ওইদিন কেন? পুরো মাস আতঙ্কিত ও শোকাহত ভাবে কাটিয়েছি। আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নিলাম।’

তিনি বলেন, ‘এখনও মাঝে মাঝে মনে পড়ে ওইদিনের কথা। বঙ্গবন্ধু ছিলেন খুবই উদর মনের মানুষ। তিনি সবাইকে ভালোবাসতেন এবং বিশ্বাস করতেন। সবাইকে কাছে ডাকতেন, এটাই ছিল তার অপরাধ। তিনি স্বাভাবিকভাবে সাধারণ মানুষের মত চলাফেরা করতেন। আমার বিশ্বাস, তিনি যদি একজন রাষ্ট্রপতির মতো চলাফেরা করতেন, তাহলে তাকে এভাবে মারতে পারত না। দেরিতে হলেও হত্যাকারীদের নাম উন্মোচিত হয়েছে। তাদের বিচার চলছে। এজন্য একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি আশাবাদী।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বাকী আকন্দ বলেন, ‘যার ডাকে মুক্তিযুদ্ধে গেলাম, যার ডাকে দেশ স্বাধীন হলো; আমাদের সেই নেতাকে হত্যার পর আমরা কীভাবে স্বাভাবিক থাকি? প্রায় এক বছর পর্যন্ত প্রচণ্ড খারাপ লেগেছে। শোক সইবার মতো অবস্থায় ছিলাম না। আরও বেশি খারাপ লেগেছে, বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত কাছের লোক; যাকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। সেই খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। ভাবতেই আৎকে উঠি। তখন নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারি না। মনের ভেতর তীব্র ঘৃণা জন্ম নেয় এসব মীরজাফরদের জন্য। তবে আমরা ভাবতে পারিনি, এদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হবে বা আমরা দেখতে পারবো। এখন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে, এতে আমরা খুবই আনন্দিত। সেইসঙ্গে আরও আনন্দিত, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা পিতার দেখানো পথে স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে যাচ্ছেন।’

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গফুর মন্ডল বলেন, ‘১৯৭৫ সালে আমি রাজশাহী পুলিশ বিভাগের টেলিকম সংস্থায় চাকরি করি। ১৫ আগস্ট সকালে ওয়্যারলেসে শুনতে পাই, শেখ সাহেবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনা শোনার পর সবাই আতঙ্কিত হয়ে গেলাম। এত বড় একজন নেতা, যার ডাকে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লো; তাকে হত্যা করা হয়েছে। দেশের প্রধানকে হত্যা করা হয়েছে? আমরা বিশ্বাসই করতে পারছি না। তখন দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে গেল। আমরা তো আগেই অস্ত্র জমা দিয়েছি। নয়তো তখনই ঝাঁপিয়ে পড়তাম প্রিয় নেতার খুনিদের ওপর। তখন দেশে ভীত-সন্ত্রস্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমরা না পারলেও জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের নেতা ও তার বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচার করতে পেরেছেন।’

বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের সাবেক ভিপি বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আনোয়ার বাদশা বলেন, ‘১৪ আগস্ট আমি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ছিলাম। আমার ভাই সেখানকার মেজর ছিলেন। আমি তার বাসায় গিয়েছিলাম। ১৫ তারিখ সকালে আমার ভাইয়ের দরজা ধাক্কা দিয়ে ডাকলেন একজন সিপাহি। দরজা খুলতেই সিপাহি বলে উঠলেন, স্যার স্যার, বঙ্গবন্ধুকে তো হত্যা করা হয়েছে। আমি তখন ঘুম থেকে উঠে গেছি। বঙ্গবন্ধুর কথা শুনতেই এগিয়ে গেলাম। শুনেই প্রায় পাগলের মতো হয়ে যাই। পরে বেতার মাধ্যমেও খবর পেলাম। তার পরিবারের সবাকেই হত্যা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলেকেও ছাড় দেওয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আমি আতঙ্কিত হই এবং ভাবতে থাকি, এখানে থাকা নিরাপদ নয়। তখনই একজনকে বলি, আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেন। তখনই রওনা দেই। দাউদকান্দি আসার পর কিছু সেনা বলেন, আপনি তো যেতে পারবেন না। দেশের পরিস্থিত ভালো না। আমি সে কথা না শুনেই চলে এলাম। কিন্তু বেশিদূর আসতে পারিনি। ঢাকা পর্যন্ত আসি। সেখানে জাতীয় জাদুঘরের কিউরেটর আমাদের এলাকার ড. এনামুল হকের কাছে আশ্রয় নেই। তারপর দু’দিন গাড়ি চলাচল বন্ধ। গাড়ি চললে বাড়ি চলে আসি। বাড়ি আসার পর আমি শোকে প্রায় কাতর। আমি অবাক হই, এত বড় মাপের একজন নেতা মারা গেলেন আর তারা বলছেন সাধারণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তাদের প্রতি আমার ঘৃণা চলে আসে। সেদিনের কথা এখনও মনে পড়ে।’

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশই শোকে কাতর ছিল না। বহির্বিশ্বও এ ঘটনায় মর্মাহত হয়। বিশ্বনেতারা শোক প্রকাশ করেন। বাঙালি জাতি হারায় তার অবিসাংবদিত নেতাকে। পরাজিত শক্তিরা মুছে ফেলতে চেয়েছিল এ দেশের স্বাধীনতার বীরত্বগাথা। তাই তো তারা সপরিবারে হত্যা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে। বাংলাদেশ এখন নেতা হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে চলছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে কাজ করে যাচ্ছেন তারই মেয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা। তারই হাতধরে আমরা আজ উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায়। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে বঙ্গবন্ধুসহ সব শহীদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

  • সর্বশেষ - ফিচার