ময়মনসিংহ, , ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের এক অনন্য দলিল

  আমেরিকা

  প্রকাশ : 

বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের এক অনন্য দলিল

‘একটি জাতির জন্ম: পূর্ব পাকিস্তান যেভাবে বাংলাদেশ হলো’ শুধু একটি বই নয়। বাংলাদেশের জন্মের সময়ের এক ঐতিহাসিক দলিল। বইটির অনুবাদক আব্দুল্লাহ জাহিদ তাঁর কথা ও সচিত্র ভূমিকায় মূল বইটির খোঁজ কীভাবে পেলেন এবং পড়ে কেন বইটি অনুবাদ করতে চাইলেন, তা বিধৃত করছেন আবেগময় ভাষায়। একটা প্রচণ্ড রকমের অনুসন্ধিৎসু মন না হলে মুক্তিযুদ্ধের ওপর এই প্রথম বইটি বাংলা ভাষায় আমরা পেতাম না হয়তো।

ইংরেজিতে ‘বার্থ অব আ ন্যাশন: দ্য স্টোরি অব হাউ ই. পাকিস্তান টার্নড ইনটু বাংলাদেশ’ নামের বইটি প্রথম ছাপা হয় ১৯৭১ সালের আগস্টে কলকাতা থেকে। কোনো লেখকের নাম না থাকা ৫৮ পৃষ্ঠার এ বই প্রকাশ করেছিলেন ইন্দু গঙ্গোপাধ্যায় ও রণজিৎ দাসগুপ্ত বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম সহায়ক সমিতির ব্যানারে। প্রথম মুদ্রণের পাঁচ হাজার কপি শেষ হতে বেশি দিন লাগেনি। দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কেন যে এমন একটি মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিলসম বইয়ের বাংলা অনুবাদ এত দিন হয়নি তাও দুর্বোধ্য। অনুবাদক আবদুল্লাহ জাহিদ যথার্থই বলেছেন, বর্তমানে এটি এক দুর্লভ দলিল। তিনি এ বইটি খুঁজে বের করে অসীম মমতা দিয়ে ভাষান্তর করে একটি অসাধারণ কাজ করেছেন। নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনি এ কাজের জন্য ঐতিহাসিক এ দলিলের মতোই অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

৭ মার্চ তারিখে ঢাকার রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের উদ্ধৃতি দিয়ে মূল কাহিনি শুরু। বিজয় অর্জিত হওয়ার চার মাস আগের, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাঁচ মাস সময়ের ঘটনাপঞ্জি সবিস্তারে বইটিতে সন্নিবেশিত হয়েছে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা মামলা, মাওলানা ভাসানি ও ছাত্র-যুবকদের সক্রিয় ও দুর্বার আন্দোলনের ফলে শেখ মুজিবের জেল থেকে মুক্তি ও ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের ঘটনাগুলোও বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে বস্তুনিষ্ঠভাবে। এমনকি স্বাধীনতার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, বিশেষত যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছার আলাপ-আলোচনা চলছে, তখনকার দৈনন্দিন পরিস্থিতির বিবরণ ও বিশ্লেষণও দেওয়া হয়েছে।

নয়টি অধ্যায়ের মধ্যে প্রথম অধ্যায়ে স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্মলগ্নের ইতিহাস বিধৃত হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ের পরিধি তিন পৃষ্ঠার কিছু বেশি। কিন্তু ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলতেই হবে যে, স্বল্প পরিসরে দেওয়া এসব তথ্যের মূল্য অপরিসীম। দ্বিতীয় অধ্যায়টিতে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন, যা পাকিস্তানের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, তা নিয়ে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের জন্য দায়ী কারণগুলো ও মাত্রাভেদে এগুলো কী ভূমিকা পালন করেছে, তা নিয়ে প্রাঞ্জল আলোচনা রয়েছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে না দেওয়ার জন্য টালবাহানা ও অনীহা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু ‘বিভক্তি নয় বরং পাকিস্তানের মধ্যেই স্বায়ত্তশাসন’—এ বিশ্বাসেই সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত। বইটিতে এ সম্পর্কিত আলোচনায় বেশ কিছু সংগত প্রশ্নের অবতারণা করা হয়েছে। আবদুল্লাহ জাহিদের ভাষান্তরে, ‘শেখ মুজিব, তার দল আওয়ামী লীগ এবং প্রকৃত প্রস্তাবও বাংলাদেশের সব মানুষকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে দোষারোপ করা হলো। কিন্তু ছয় দফা কর্মসূচি যেটা ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করেছিল, তার কোথাও কি বলা হয়েছিল রাষ্ট্রের বিভক্তিকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই ধরনের কিছুই না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ (প্রকৃত পক্ষে অন্য সব দল) ধৈর্য সহকারে আশা করেছিল এবং কাজ করছিল যতক্ষণ না ইয়াহিয়ার সৈন্য বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ‘পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের’ বাসনা গুঁড়িয়ে দিল।’ একই অধ্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমান আমেরিকার টাইম পত্রিকার সাংবাদিককে ১৯৭১ সালের ১০ মার্চ দেওয়া সাক্ষাৎকারের উদ্ধৃতি রয়েছে, যেখানে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি পাকিস্তানকে ভাংতে চাই না। কিন্তু বাঙালিদের অবশ্যই স্বায়ত্তশাসন দরকার, যেন তারা পশ্চিম অংশের উপনিবেশ হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।’

সমস্ত আলোচনা ব্যর্থ হলে ও ২৫ মার্চের সেই ভয়াবহ কালরাতের পর সর্বাত্মক যুদ্ধ ছাড়া আর গত্যন্তর থাকেনি। একদিকে প্রাণের ভয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে গণমানুষ, রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের ভারতে পলায়ন ও আশ্রয় গ্রহণ, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তিকে একত্রিত করে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামোতে আনার পাশাপাশি মিত্র দেশের সক্রিয় সহায়তায় প্রশিক্ষণসহ যুদ্ধ সরঞ্জাম সংগ্রহ, বিশ্বজনমত ও স্বীকৃতি আদায়—ইত্যাদি সব কাজ অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারে কাঁধে চাপে।

আবদুল্লাহ জাহিদ অনূদিত মুক্তিযুদ্ধের এই প্রথম গ্রন্থটি সাক্ষ্য দেয়, মুজিবনগর সরকার এ দায়িত্ব ভারতের সহায়তা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘের সমর্থনে কত সফলভাবে করে যাচ্ছিল। বইটিতে সঠিকভাবেই বলা হয়েছে, মুক্তির সংগ্রামে সফল হওয়ার পেছনে যে অসাধারণ শক্তি কাজ করছিল, তা হলো—‘এটি এমন একটি সংগ্রাম, যেখানে হাইকোর্টর বিচারপতি থেকে সামরিক সরকারের গভর্নরের বাবুর্চি পর্যন্ত একসঙ্গে যোগ দিয়েছেন। বেশির ভাগ স্বাধীনতা সংগ্রামে বেসামরিক কর্মকর্তা ও পুলিশ শত্রুপক্ষের সঙ্গে থাকে। এমনকি ভারতের স্বাধীনতার সময়ও সেটা দেখা গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রায় সব বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ ও বহু শীর্ষ আমলা এই সংগ্রামে যোগ দেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এটি অভূতপূর্ব ঘটনা।’

এমন অভূতপূর্ব আরও অনেক ঘটনার উল্লেখ বইটিতে রয়েছে। দেশি-বিদেশি বহু সংবাদদাতা, সংবাদপত্র, গবেষকদের মতামত তুলে ধরার মধ্য দিয়ে বইটি হয়ে উঠেছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ, নির্ভরযোগ্য ও তথ্যবহুল। বইটি ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তর করে বিলম্বে হলেও আবদুল্লাহ জাহিদ প্রশংসনীয় একটি দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রচ্ছদে ধ্রুব এষ চমৎকার কাজ করেছেন। তবে ইংরেজিতে মূল বইয়ের শিরোনাম আরও উজ্জ্বল হলে ইংরেজিভাষী আমাদের ছেলেমেয়ে ও বিদেশির জন্য ভালো হতো। সমগ্র প্রকাশনের উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। বইটি পাঠক সমাজে আদৃত হবে, বাংলাদেশ ও এর মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে যারা গবেষণা করবেন, তারা এ বই পাঠে উপকৃত হবেন—এটা নিশ্চিত।

একটি জাতির জন্ম: পূর্ব পাকিস্তান যেভাবে বাংলাদেশ হলো’
ভাষান্তর: আবদুল্লা জাহিদ
সমগ্র প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি ২০১৯।

পৃষ্ঠা: বাংলা অংশ: ৮৪;
ইংরেজি মূল বই: ৫৮

  • সর্বশেষ - অতিথি কলাম