ময়মনসিংহ, , ২২ চৈত্র ১৪২৬ অনলাইন সংস্করণ

দেশে করোনায় প্রথম মৃত্যু, আক্রান্ত ১৪

  অনলাইন ডেস্ক

  প্রকাশ : 

দেশে করোনায় প্রথম মৃত্যু, আক্রান্ত ১৪
ছবি:সংগৃহীথ

বৈশ্বিক মহামারির রূপ নেওয়া করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এক জনের মৃত্যু হয়েছে। তার বয়স ৭০-এর বেশি। রাজধানীর বাসাবোর ঐ বাসিন্দা বিদেশফেরত নন, তবে বিদেশ থেকে আসা সংক্রমিত এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তিনি আক্রান্ত হন। তার আগে থেকেই ফুসফুসে সমস্যা ছিল; এছাড়া ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি জটিলতা ছিল। হূদ্যন্ত্রে একবার স্টেন্টিংও হয়েছিল তার। গতকাল বুধবার সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা এ তথ্য জানিয়ে বলেন, ‘মারা যাওয়া ব্যক্তিটি পুরুষ। তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। তিনি উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন এবং আমরা তাকে হারিয়েছি।’

ডা. ফ্লোরা জানান, ‘মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে রোগটি যেন ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কীভাবে তাকে দাফন করতে হবে তা স্বজনদের বলে দেওয়া হয়েছে। আমাদের লোকও সেখানে গেছে। ঐ ব্যক্তি থেকে কোনোভাবে যেন রোগটি অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে—সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

আক্রান্ত ১৪, সুস্থ ৩

গত ২৪ ঘণ্টায় আরো চার জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে। তাদের মধ্যে প্রথম দফায় আক্রান্ত তিন জন এরই মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন; বাকিরা হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ডা. ফ্লোরা বলেন, নতুন আক্রান্ত চার জনের মধ্যে একজন নারী ও তিন জন পুরুষ। তাদের মধ্যে একজন আগে আক্রান্ত একজনের সংস্পর্শে এসেছিলেন। বাকি তিন জন বিদেশফেরত, দুজন ইতালি থেকে এবং একজন কুয়েত থেকে এসেছেন। বয়স ২০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। নতুন আক্রান্ত চার জনের অবস্থা আশঙ্কজনক বলে জানা গেছে।

এদিকে সংবাদমাধ্যম সিএনএনের চিফ মেডিক্যাল করসপনডেন্ট ড. সঞ্জয় গুপ্ত বলেছেন, ‘বাংলাদেশে ডাক্তার-নার্স ও চিকিত্সার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাদের সুরক্ষাসরঞ্জাম সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, নইলে এ রোগের চিকিত্সা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ ভীতি উপেক্ষা করে করোনা আক্রান্ত রোগীদের পাশে দাঁড়াতে চিকিত্সকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘চিকিত্সক-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে। ডাক্তারদের সেবা প্রদান থেকে বিরত থাকা যাবে না।’

ঢাকায় চার হাসপাতালে চিকিত্সার ব্যবস্থা

এদিকে ইউরোপফেরতদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ কারণে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে। আবার ডাক্তারি সার্টিফিকেট ছাড়াই অনেকে বিদেশ থেকে দেশে এসেছেন। যাদের হাঁচি, কাশি, গলায় ব্যথা ও জ্বর তাদের জন্য ঢাকায় চারটি হাসপাতালকে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সার জন্য নির্দিষ্ট করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এগুলো হলো মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। তবে শুধু এই চারটি হাসপাতাল নয়, রাজধানীর সব হাসপাতাল এমনকি পুরো দেশ জুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। কিন্তু যারা করোনা রোগীদের সেবা দেবেন সেই ডাক্তারদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার উন্নতি হয়নি। অনেক হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সরা আতঙ্কিত। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ অনেক হাসপাতালের চিকিত্সকরা জ্বর, সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের সেবা প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলছেন, কারোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে বড়ো চিকিত্সক টিম থাকা উচিত। যারা দুই ভাগ করে সার্বক্ষণিক সেবা দিতে পারে। এ জন্য সবার আগে ডাক্তার-নার্সসহ চিকিত্সাসেবা কর্মীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

পরীক্ষার ব্যবস্থা হচ্ছে ঢাকার বাইরেও

করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ঢাকার বাইরে কয়েকটি স্থানে নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আইইডিসিআরের সার্বিক তত্ত্বাবধানেই এটা হবে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কয়েকটি গবেষণাগারে এ পরীক্ষা শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের হটলাইনে ফোন এসেছে ৪ হাজার ৮৫৭টি। এর মধ্যে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত ফোন ৪ হাজার ৬৪২টি। নতুনভাবে ৪৯ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এ দিয়ে মোট ৩৪১ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হলো। এছাড়া ১৫ জন আইসোলেশনে আছেন। ৪২ জনকে রাখা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে। ডা. ফ্লোরা বলেন, করোনা ভাইরাসের ফলে হওয়া কোভিড-১৯ রোগটি মারাত্মক নয়। কিন্তু ভাইরাসটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এখানে মৃত্যু ঝুঁকি থাকে না। এ ক্ষেত্রে সচেতন হওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

চার চিকিত্সক কোয়ারেন্টাইনে

করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চার চিকিত্সককে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে দুজন মেডিসিন বিভাগের ও দুজন নেফ্রোলজি বিভাগের চিকিত্সক। ঢাকা মেডিক্যালের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, সর্দি-কাশি নিয়ে এলে হাসপাতালের চিকিত্সকরা চিকিত্সা দিয়ে থাকেন। কার সাধারণ সর্দি-কাশি আর কে নতুন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রয়েছে তাতো প্রথমে জানা যায় না। এদিকে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) সকল প্রকার শিক্ষা কার্যক্রম ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বিভাগীয় পর্যায়ে করোনা ইউনিট

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক এমপি বলেছেন, খুব দ্রুতই দেশের আট বিভাগে নতুন করোনা ইউনিট স্থাপন করা হবে। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় করণীয় শীর্ষক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। সভায় করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। করোনা ভাইরাসের কারণে বেশি মানুষ কোয়ারেন্টাইনে রাখার প্রয়োজন হলে ঢাকার চার হাসপাতালের পাশাপাশি টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দান প্রস্তুত করার জন্যও নির্দেশনা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ।

বিদেশফেরত যাত্রীগণ কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম মানছে না—এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, তাদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকার সকল নিয়ম মেনে চলতে হবে। নইলে আইনানুগ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। সভায় দেশের চিকিত্সকদের প্রটেকশনের জন্য বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান এমপি ৬০০০ বিশেষ গাউন প্রদানের আশ্বাস দেন।

ফেসবুকে জানা যাবে তথ্য

সভায় আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সাব্রিনা ফ্লোরা সামাজিক মাধ্যমে করোনা বিষয়ে অবগত হতে নতুন একটি ইমেইল আইডি ও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলার কথা জানান। তথ্য মতে, আইইডিসিআর-এর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হচ্ছে-iedcr,COVID-19 Control Room

সক্রিয় ১৭ হটলাইন

এছাড়া সরাসরি যোগাযোগের জন্য ১৭টি হটলাইন খোলা হয়েছে। যার নম্বরগুলো হচ্ছে: ৩৩৩, ১৬২৬৩, ০১৫৫০০৬৪৯০১, ০১৫৫০০৬৪৯০২, ০১৫৫০০৬৪৯০৩, ০১৫৫০০৬৪৯০৪, ০১৫৫০০৬৪৯০৫, ০১৪০১১৮৪৫৫১, ০১৪০১১৮৪৫৫৪, ০১৪০১১৮৪৫৫৫, ০১৪০১১৮৪৫৫৬, ০১৪০১১৮৪৫৫৯, ০১৪০১১৮৪৫৬০, ০১৪০১১৮৪৫৬৩, ০১৪০১১৮৪৫৬৮, ০১৯২৭৭১১৭৮৪, ০১৯২৭৭১১৭৮৫, ০১৯৩৭০০০০১১, ০১৯৩৭১১০০১১।

এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী গতকাল সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এফ-ব্লকে লিনিয়ার এক্সিলেরেটর মেশিন উদ্বোধনকালে বলেছেন, করোনা রোগীর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। বিদেশফেরতদের অবশ্যই সেলফ আইসোলেশনে থাকতে হবে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া।

  • সর্বশেষ - আলোচিত খবর