, ২ কার্তিক ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার আদলে বদলে যাচ্ছে জাতীয় চিড়িয়াখানা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার আদলে বদলে যাচ্ছে জাতীয় চিড়িয়াখানা

ঢাকায় আসা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিনোদনের অন্যতম জায়গা জাতীয় চিড়িয়াখানা। ১৯৭৪ সালে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হওয়া চিড়িয়াখানায় কয়েক যুগে বিভিন্ন পরিবর্তন এসেছে। যুক্ত হয়েছে নতুন প্রজাতির পশু-পাখি। সেগুলোর কোনোটি বিদেশ থেকে আনা আবার কোনোটির এখানেই জন্ম হয়েছে। যদিও এখনো চিড়িয়াখানার ব্যবস্থাপনা এবং প্রদর্শনের ধরন নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

এ অবস্থায় এবার পুরো চিড়িয়াখানাকেই ডিজিটালাইজড ও বিশ্বমানের করে বদলে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্পূর্ণ বিদেশি মাস্টারপ্ল্যানে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার চিড়িয়াখানার আদলে গড়ে তোলা হবে জাতীয় চিড়িয়াখানা। এই প্ল্যান পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে জাতীয় চিড়িয়াখানা প্রকৃতই হয়ে উঠবে বিনোদনের অন্যতম আকর্ষণ।

চিড়িয়াখানার দুটি গেট হবে। যেটি আছে সেটি থাকবে। লেকের পশ্চিম পাশে বেড়িবাঁধে দ্বিতীয় গেট হবে। দুই গেট মিলে ৯০০ থেকে ১০০০ গাড়ি রাখা যাবে। সামনের ৫০ বছরকে টার্গেট করে আমরা এগোচ্ছি। সিঙ্গাপুর চিড়িয়াখানাকে আমরা মোটামুটি আদর্শ মনে করে কাজ করছি

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চিড়িয়াখানার মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে কাজ করছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান বার্নার্ড হ্যারিসন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস লিমিটেড। এই কোম্পানির টিম লিডার বার্নার্ড হ্যারিসন নিজেই মূল দায়িত্বে রয়েছেন। ইন্দোনেশিয়ার বালিতে বসবাসরত বার্নার্ড হ্যারিসন আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে কাজটি পেয়েছেন।

বার্নার্ড হ্যারিসন সিঙ্গাপুরের চিড়িয়াখানার কাজ করেছেন। এছাড়া মাস্টারপ্ল্যান কমিটির সদস্য রেজা খান দুবাই চিড়িয়াখানার কাজ করেছেন।

চার ভাগে বিভক্ত এই মাস্টারপ্ল্যানের দুটি অংশ এরই মধ্যে হাতে পেয়েছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। বাকি দুটি অংশ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে হস্তান্তরের কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানা গত শতকের শুরুর দিকের ধ্যান-ধারণায় তৈরি। গত এক দশকে দেশের প্রায় সব ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে সারাবিশ্বে চিড়িয়াখানাকেন্দ্রিক বিনোদনের চিন্তাধারাও আমূল বদলে গেছে। উভয় দিক বিবেচনায় চিড়িয়াখানার আধুনিকায়ন দরকার। এ কাজে প্রয়োজন হয় আন্তর্জাতিক মানের মাস্টারপ্ল্যান। সে জন্যই আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বার্নার্ড হ্যারিসন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস লিমিটেডকে কাজ দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানিয়েছেন, বাংলাদেশে এসে একটি ওয়ার্কশপের মাধ্যমে তাদের মাস্টারপ্ল্যানের প্রেজেন্টেশন দেয়ার কথা ছিল। করোনা মহামারির কারণে তারা আসতে পারেননি। তাই ভার্চুয়াল বৈঠকেই অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ।

জাতীয় চিড়িয়াখানাকে মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে আধুনিক ও বিশ্বমানে রূপান্তর করা হবে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের চিড়িয়াখানার আদলে জাতীয় চিড়িয়াখানাকে গড়ে তোলা হবে। এ লক্ষ্যে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলছে

বর্তমানে জাতীয় চিড়িয়াখানায় ১৮৬ একর জায়গায় ১৩৫ প্রজাতির প্রায় ৩ হাজার ১৫০টি পশু-পাখি রয়েছে।

মাস্টারপ্ল্যান পুরোপুরি হাতে পাওয়ার পর বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে জাতীয় চিড়িয়াখানার আমূল পরিবর্তন ঘটবে। উন্নত বিশ্বের আধুনিক চিড়িয়াখানার আদলে বিভিন্ন প্রাণী বিভিন্ন জোনে বিভক্ত থাকবে। প্রাকৃতিক ব্যারিয়ারের মাধ্যমে প্রতিটি প্রাণীর শেড দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপিত হবে।

আধুনিক চিড়িয়াখানায় যা থাকছে
মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী চিড়িয়াখানার সীমানা দেয়াল হবে পাইলিং সিস্টেমে। যাতে বাইরে থেকে কোনো স্যুয়ারেজের লাইন চিড়িয়াখানার ভেতরে কেউ ঢোকাতে না পারে। সীমানা দেয়ালের পাশ দিয়ে একটি বাফার জোন থাকবে। একটি ওয়াকওয়ে থাকবে, এরপর থাকবে একটি সবুজ বেষ্টনী।

jagonews24

গোটা চিড়িয়াখানাকে পাঁচটি জোনে ভাগ করা হবে। এর মধ্যে থাকবে সুন্দরবনকেন্দ্রিক প্রাণী নিয়ে ‘বাংলাদেশ হ্যাবিটেট জোন’। ‘ওকাভাঙ্গো জোন’-এ থাকবে দক্ষিণ আফ্রিকাকেন্দ্রিক গন্ডার, জিরাফ, জেব্রা, জলহস্তির মতো প্রাণীগুলো। পোষা প্রাণীর জন্য ‘পেট অ্যানিমেল’র একটা জোন হবে। শিশুদের খেলাধুলার জন্য হবে ‘অ্যাক্টিভ জোন’। অনেকটা সাফারি পার্কের আদলে ‘নাইট সাফারি জোন’ থাকবে।

এছাড়া চিড়িয়াখানার লেকের ওপর একটি ভাসমান রেস্তোরাঁ থাকবে। সেখানে বার্ড শো এবং ডলফিন শো করার চিন্তা রয়েছে। আধুনিক এ চিড়িয়াখানায় ‘ট্রাভেল জোন’ করা হবে। সেখানে ট্রাভেল কার্ড নিয়ে দর্শনার্থীরা আলাদা রোড দিয়ে প্রতিটি খাঁচার সামনে চিড়িয়াখানার গাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন। এই কার্ডের মাধ্যমে সরকার যেমন রেভিনিউ পাবে, তেমনি মানুষ নির্বিঘ্নে গাড়িতে চড়ে ঘুরে দেখতে পারবেন। এটা হবে বিকল্প রাস্তা, সেখানে সাধারণ মানুষ চলাচল করবে না।

চিড়িয়াখানার প্রতিটি খাঁচা উপস্থাপিত হবে প্রাকৃতিকভাবে। যে প্রাণীগুলো খাঁচায় আবদ্ধ, সেগুলো আর আবদ্ধ থাকবে না। এসব পশু এবং দর্শনার্থী উভয়ই উন্মুক্ত থাকবে। উভয়ের মাঝে একটি প্রাকৃতিক বেষ্টনী থাকবে। পানি বা একটি ইলেকট্রিক সিঙ্ক থাকবে, যা লতাপাতা দিয়ে প্যাঁচানো থাকবে এবং প্রাকৃতিক মনে হবে। পশু ও দর্শনার্থী উভয়ই উন্মুক্ত থাকলেও কেউ কারও কাছে যেতে পারবে না।

মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী চিড়িয়াখানায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকবে। পশুর বর্জ্য রিসাইক্লিং করা হবে, যেন পরিবেশ দূষণ না হয়। ব্যাকআপ অফিস থাকবে। সাধারণ দর্শনার্থীরা যে রাস্তা ব্যবহার করবেন চিড়িয়াখানার কর্মীদের জন্য থাকবে আলাদা রাস্তা। যাতে দর্শনার্থীদের কোনো সমস্যা না হয়। আবাসিক এলাকায় মাল্টিস্টোরেড বিল্ডিং হবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। এখানে পরিচালকদের জন্য আলাদা একটা বাসা থাকবে। সেখানে শিশুদের খেলার মাঠ থাকবে, শিশুপার্ক থাকবে বিনোদনের জন্য।

jagonews24

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে মাস্টারপ্ল্যানটি হাতে পেলে এরপর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) করা হবে। ফাইনাল মাস্টারপ্ল্যান হলে এর পেছনে কতো টাকা লাগবে তার একটি হিসাব দেয়া হবে। সেই প্রকল্প একনেকে উঠবে। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিলে কাজ শুরু হবে।

সার্বিক বিষয়ে চিড়িয়াখানার পরিচালক মো. আব্দুল লতিফ জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশ এগিয়ে যাচ্ছে উন্নয়নের মহাসড়কে। সেদিক বিবেচনায় চিড়িয়াখানা ডিজিটালাইজড ও আধুনিক হওয়া দরকার। আধুনিক কনসেপ্টে যে চিড়িয়াখানা সেটি করতে হলে মাস্টারপ্ল্যান দরকার। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান বার্নার্ড হ্যারিসন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস লিমিটেড এ প্ল্যান নিয়ে কাজ করছে। যখন এটি বাস্তবায়ন হবে তখন কিন্তু চিড়িয়াখানা বন্ধ থাকবে না। একটা পার্ট বন্ধ থাকবে। যেমন এখন জাতীয় চিড়িয়াখানার উত্তর দিক ফ্রি আছে। আমরা প্রাণীগুলো শিফটিং করে কাজ করবো। এটা একপর্যায়ে হবে না। ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো মাস্টারপ্ল্যান হাতে পেলে পরবর্তী বছর তা বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চিড়িয়াখানার দুটি গেট হবে। যেটি আছে সেটি থাকবে। লেকের পশ্চিম পাশে বেড়িবাঁধে দ্বিতীয় গেট হবে। দুই গেট মিলে ৯০০ থেকে ১০০০ গাড়ি রাখা যাবে। সামনের ৫০ বছরকে টার্গেট করে আমরা এগোচ্ছি। সিঙ্গাপুর চিড়িয়াখানাকে আমরা মোটামুটি আদর্শ মনে করে কাজ করছি। বার্নার্ড হ্যারিসনই সিঙ্গাপুরের চিড়িয়াখানার কাজটি করেছেন। এছাড়াও দুবাই চিড়িয়াখানার কাজ করা রেজা খান মাস্টারপ্ল্যান কমিটির সদস্য।’

এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘জাতীয় চিড়িয়াখানাকে মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে আধুনিক ও বিশ্বমানে রূপান্তর করা হবে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের চিড়িয়াখানার আদলে জাতীয় চিড়িয়াখানাকে গড়ে তোলা হবে। এ লক্ষ্যে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিঙ্গাপুরের কনসালট্যান্ট নিয়োগ করা হয়েছে। চিড়িখানায় প্রাণীদের সাফারি পার্কের মতো করে রাখা হবে। চিড়িয়াখানার ভেতরে আলাদা জোন তৈরি করে একই জাতীয় প্রাণী বা পাখি একই জোনে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। চিড়িয়াখানাকে অপেক্ষাকৃত আধুনিক পর্যায়ে আমরা নিয়ে যাচ্ছি। মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের পর বাংলাদেশেই হবে আধুনিক চিড়িয়াখানা।’

  • সর্বশেষ - মিডিয়া