, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০ অনলাইন সংস্করণ

কেনার চেয়ে সাড়ে সাত গুণ বেশি শেয়ার বিক্রি করেছে বিদেশিরা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

কেনার চেয়ে সাড়ে সাত গুণ বেশি শেয়ার বিক্রি করেছে বিদেশিরা

বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা ও টালমাটাল পুঁজিবাজারে পুঁজি হারানোর ভয়ে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। গেল সেপ্টেম্বরেই তারা কেনার চেয়ে সাড়ে সাত গুণ বেশি শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। শেয়ার বিক্রি করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না বিদেশিরা, পুঁজিবাজার ছেড়ে চলেও যাচ্ছেন। বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও শেয়ার সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ (সিডিবিএল) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিএসইসির তথ্য মতে, বিদেশিরা দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত সেপ্টেম্বর মাসে ৪৪ কোটি ২ লাখ ৬২ হাজার ৪৮১ টাকার শেয়ার কেনার পরিবর্তে ৩৩৩ কোটি ৪৩ লাখ ১৮ হাজার ১৩ টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। অর্থাৎ কেনার তুলনায় ২৮৯ কোটি ৪০ লাখ ৫৫ হাজার ৫৩২ টাকার শেয়ার বেশি বিক্রি করেছেন। এতে মোট লেনদেন হয়েছে ৩৭৭ কোটি ৪৫ লাখ ৮০ হাজার ৪৯৪ টাকা।

এর আগের মাস আগস্টে বিদেশিদের শেয়ার কেনা-বেচা বাবদ লেনদেন হয়েছিল ৭৫৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩৬ হাজার ১১৩ টাকা। এর মধ্যে শেয়ার কিনেছিল ৮৬ কোটি ২০ লাখ ৮০ হাজার ৩৯৫ টাকার। আর শেয়ার বিক্রি করেছিল ৬৬৮ কোটি ৪২ লাখ ৫৫ হাজার ৭১৮ টাকার। সেই হিসাবে তারা শেয়ার কেনার চেয়ে ৫৮২ কোটি ২১ লাখ ৭৫ হাজার ৩২৩ টাকার শেয়ার বেশি বিক্রি করেছিলেন।

শুধু এই বছর দুই মাসে কমেছে বিষয়টি এমন নয়, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায়ও বিদেশিদের লেনদেন ও নিট বিনিয়োগ কমেছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিদেশিদের শেয়ার লেনদেন হয়েছিল ৫০১ কোটি ৫০ লাখ ৯ হাজার টাকার। সেই বছর কেনার চেয়ে ২১১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার বেশি বিক্রি করেছিলেন। অর্থাৎ ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায়ও ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিদেশিরা ৭৮ কোটি টাকার শেয়ার বেশি বিক্রি করেছেন।

তারা শুধু শেয়ার বিক্রি করে ক্ষান্ত হয়নি। সিডিবিএলের তথ্যে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে ৩০৮ জন বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবধারী তাদের হাতে থাকা সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে বাজারও ছেড়েছেন। তার পরের মাস অক্টোবরে বাজার ছেড়েছে আরও ৬৬ জন বিওধারী। গত ১ সেপ্টেম্বর বিদেশিদের বিও হিসাব ছিল ৬৩ হাজার ৪২১টি। সেখান থেকে ৩৭৪টি কমে গত ২ নভেম্বর বিদেশিদের বিও হিসাব দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৪৭টিতে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা বাংলাদেশে পড়েছে। সে কারণে ডলারের বাজার অস্থির, ডলারের সংকটও রয়েছে। অন্যদিকে ফ্লোর প্রাইস আরোপসহ নানা ইস্যুতে টালমাটাল রয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। এছাড়াও বাজারে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় বিদেশিরা পুঁজি হারানোর ভয়ে শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলে নিচ্ছেন।

নাম না প্রকাশের শর্তে বিদেশি পোর্টফলিও নিয়ে কাজ করা এটি ব্রোকার হাউজের প্রধান জানান, বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অবদান ১-২ শতাংশ। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এই বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ফ্লোর প্রাইস না থাকলে আরও কিছু বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করে দিত। কিন্তু তারা ফ্লোর প্রাইসে আটকা পড়েছে। শেয়ার বিক্রি করতে পারছে না।

বিদেশিরা স্থিতিশীল বাজারে শেয়ার কেনেন

বিদেশিরা সবসময় স্থিতিশীল বাজারে শেয়ার কেনেন বলে জানিয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বিএসইসি’র সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দার কারণে টাকার মান কমছে। উল্টো ডলারের দাম ওঠা-নামা করছে, এমনকি প্রয়োজন মেটাতে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। এই ভয়ে শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে ডলারে কনভার্ট করে টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছেন তারা। তবে ডলারের মূল্য স্থিতিশীল হলে বিদেশিরা হিসাব করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করবেন বলে প্রত্যাশা তার।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহম্মেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা এবং কারসাজি চক্রের হাতে বাজার চলে যাওয়ার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলে নিচ্ছেন। তারা সেফ জোনে চলে যাচ্ছেন।

সিডিবিএলের তথ্যে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে ৩০৮ জন বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবধারী তাদের হাতে থাকা সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে বাজারও ছেড়েছেন। তার পরের মাস অক্টোবরে বাজার ছেড়েছেন আরও ৬৬ জন বিওধারী। গত ১ সেপ্টেম্বর বিদেশিদের বিও হিসাব ছিল ৬৩ হাজার ৪২১টি। সেখান থেকে ৩৭৪টি কমে গত ২ নভেম্বর বিদেশীদের বিও হিসাব দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৪৭টিতে

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী ঢাকা পোস্টকে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দার পাশাপাশি বিনিয়োগের জন্য ভালো কোম্পানি না থাকা এবং পুঁজিবাজার সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। তারা শেয়ার বিক্রি করে চলে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

কী কারণে বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করেছেন বলা মুশকিল

বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করেছেন ডিএসইর চিফ অপারেটিং অফিসার ও মুখপাত্র এম সাইফুর রহমান মজুমদার। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, কী কারণে বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করেছেন তা বলা মুশকিল। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও ডলারের বাজারে অস্থিরতা থাকায় এখন বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।

ডিএসই’র পরিচালক শাকিল রিজভী ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিদেশিরা কখনো লোকসানের জন্য বিনিয়োগ করেন না। যখন নিশ্চিত হন যে মুনাফা হবে তখন তারা বিনিয়োগ করেন। এখন বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থা ও ডলারের বাজারে অস্থিরতার কারণে শেয়ার বিক্রি করে পুঁজি তুলে নিচ্ছেন তারা। আবার যখন দেখবেন শেয়ারের দাম বাড়ছে, এই বাজারে মুনাফা হচ্ছে তখন তারা ঠিকই বিনিয়োগ করবেন, এটাই স্বাভাবিক।

বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে : বিএসইসি

বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে বলে স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম। তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ কিছুটা কমলেও প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এ কারণে বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে।

তিনি বলেন, কারেন্সি যখন দুর্বল হয় ডলার তখন স্ট্রং হয়, তখন এক্সিস্টিং ইনভেস্টররা ফরেন এক্সচেঞ্জ ফ্লাকচুয়েশন রিস্ক মিনিমাইজ করার জন্য সেল করে দেন। তবে যারা নতুন ইনভেস্টর, যারা ডলার বাংলাদেশে নিয়ে আসেন, তাদের জন্য ডলারের দাম বেনিফিট হিসেবে কাজ করে। তারা কম ডলার এনে বেশি টাকার শেয়ার কিনতে পারবেন।

রেজাউল করিম বলেন, ডলারের ঊর্ধ্বগতি আগামী এক কিংবা দুই মাসের মধ্যে কিছুটা কমে আসবে। কারণ রপ্তানি আগের তুলনায় বেড়েছে। ডলারের দাম কমে গেলে বর্তমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি কমে যাবে। নতুন নতুন বিনিয়োগকারী আসবে। এর ফলে আগামী জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি থেকে বিদেশিদের শেয়ার কেনার অর্ডার বেশি থাকবে। তিনি জানান, এখন কিছু বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসার জন্য পথ খুঁজছেন।

তিনি আরও বলেন, প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে কীভাবে পোর্টফলিও ইনভেস্টমেন্ট করতে পারেন সেই খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। যেসব কাস্টডিয়ান বিদেশি পোর্টফলিও পরিচালনা করে, এক্ষেত্রে ব্যাংকের কাস্টডিয়ানের বেশি খোঁজ-খবর নিচ্ছেন প্রবাসীরা। আশা করছি, আগামীতে প্রবাসীদের বিনিয়োগ বাড়বে।

  • সর্বশেষ - অর্থ-বাণিজ্য