, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০ অনলাইন সংস্করণ

ময়মনসিংহের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চলছে হযবরল পরিস্থিতি : গঠনতন্ত্র বিরোধী কর্মকাণ্ড

  শাহ মোহাম্মদ রনি

  প্রকাশ : 

ময়মনসিংহের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চলছে  হযবরল পরিস্থিতি : গঠনতন্ত্র বিরোধী কর্মকাণ্ড

ময়মনসিংহে আওয়ামী পন্থী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চলছে হযবরল পরিস্থিতি। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে দ্বন্দ্ব ও গ্রুপিং। অভিযোগের শেষ নেই একে অপরের বিরুদ্ধে। ফেসবুক পোস্টে চালানো হয় বিষোদগার। হাস্যরসে পরিণত হয়েছে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানান ঘটনা। চলছে গঠনতন্ত্র বিরোধী কর্মকাণ্ড। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটে গ্রুপিংয়ের সুযোগে অনুপ্রবেশ করেছে ভিন্ন মতাদর্শ সমর্থকরা। এতে স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছে স্বাধীনতার সপক্ষের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গন। প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের সুযোগ নিচ্ছে বিএনপি-জামায়াত জোট সমর্থকরা। ২ অঙ্গনেই দাপট দেখাচ্ছেন ২ ডজন অনুপ্রবেশকারী। অধিকাংশরাই প্রাধান্য পাচ্ছেন সরকারি এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। আংশিক দখল করা হয়েছে ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের পাঠচক্র ‘বীক্ষণ’। অপরদিকে ময়মনসিংহ জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে প্রভাব বিস্তারের পাঁয়তারা চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক ২ আনাড়ি। তাদের একজন নারী। অপরজন পুরুষ। ফানি সম্পর্কে তারা খালা-ভাগ্নে। শিল্পকলার আহবায়ক কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য দু’জন মরিয়া হয়ে ওঠেছেন। সদস্য হওয়ার জন্য তারা সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকরা জাগ্রত বাংলাকে জানিয়েছেন, ময়মনসিংহ জেলা শিল্পকলা একাডেমীর আহবায়ক কমিটির সদস্য হওয়ার মতো সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাদের কোনো অবদান নেই। সদস্য পদ পেতে হলে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অসামান্য ও বিশেষ অবদান থাকতে হয়।

জানা যায়, ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের কমিটি নিয়ে ৬ বছর আগে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ২ বছর আগে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। দেড় বছর আগে দখল হয়ে যায় ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য সংসদের পাঠচক্র ‘বীক্ষণ’ এর একাংশ। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে এক পক্ষ সাহিত্য সংসদের আঙ্গিনা দখলের পর তাদের মতো করে ‘বীক্ষণ’ চালিয়ে যাচ্ছে। মূল পক্ষ অন্য একটি সংগঠনের কার্যালয়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত ‘বীক্ষণ’ আসর চালাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সাহিত্য সংসদের দ্বন্দ্ব গড়ায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। চিহ্নিতরা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট দখল করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। গঠিত হয় পাল্টাপাল্টি কমিটি। স্বাধীনতার সপক্ষ এবং প্রগতিশীল সংগঠন নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা জিয়া উদ্দিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর বাসার ভাষাণীর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়। পরে নাট্যজন ফরিদ আহমেদ দুলাল ও অ্যাডভোকেট আব্দুল মোত্তালেব লাল বিভিন্ন মতাদর্শের সংগঠনের প্রধানদের নিয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পাল্টা কমিটি গঠন করেন। এর পরই সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গন উত্যপ্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয় পক্ষে-বিপক্ষে বিষোদগার। দ্বন্দ্ব গড়ায় হুমকি-ধামকিতে। দখল ও প্রাণনাশের হুমকির বিষয়ে অভিযোগ করা হয় কোতোয়ালি মডেল থানায়। দুলাল-লাল গ্রুপের ২ ব্যক্তির অশালীন ফেসবুক পোস্ট নগরবাসীকে ভাবিয়ে তুলে। হিস্যা নিয়ে নিজ গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে শেষ পর্যন্ত তারাই ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে অব্যাহতি নেন। প্রায় দেড় মাস আগে গঠন করা হয়েছে দুলাল-লাল গ্রুপের ৩১ সদস্যের কমিটি। নারী কেলেঙ্কারীতে জড়িত ২ সংগঠক ছাড়াও কমিটিতে স্থান পেয়েছেন ৭ বিএনপি-জামায়াত জোট সমর্থক ও সর্বহারা। মেধাক্রম না করেই প্রশ্নবিদ্ধ, নব্য ও মুখচেনাদের রাখা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। এ নিয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে পোস্ট দেন। এর পর থেকেই ঝিমিয়ে পড়েছে সকল কর্মকাণ্ড।

সূত্র জানায়, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ২ গ্রুপেই গঠনতন্ত্র বিরোধী ভিন্ন মতাদর্শের ২ ডজন সমর্থক রয়েছেন। এর মধ্যে দুলাল-লাল গ্রুপে ১৭-১৮ এবং জিয়া-ভাষাণী গ্রুপে ৬-৭ জন। ‘দ’, ‘র’, ‘জ’, ‘ম’, ‘শ’, ‘হ’, ‘স’, ‘আ’, ‘অ’, ‘ল’, ‘র’, ‘হ’ এবং ‘র’ অদ্যাক্ষরের (নামের শেষ শব্দের প্রথম অক্ষর) ব্যক্তিরা অন্যতম। এরা বিএনপি-জামায়াত জোট সমর্থক হলেও দাপটের সাথে সরকারি এবং আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে তাদের সংগঠনের পরিবেশনা চালায়। তারা সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নব্য এক নেতার ইন্ধনে জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতার নাম ভাঙ্গিয়ে অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়। তাদের কাছে ধরাশায়ী হচ্ছেন স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তির কর্মীরা। ময়মনসিংহে এই ২ অঙ্গনের ভিন্ন পরিস্থিতির জন্য দায়ীদের বিচার দাবি করেছেন স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভিন্ন মতাদর্শ সমর্থকদের দাপটের জলন্ত প্রমাণ এক মাস আগে টাউন হল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ৭ দিনব্যাপী ‘ময়মনসিংহ বিভাগীয় বইমেলা’। ৬ দিনের সাংস্কৃতিক পর্বে সুযোগ দেওয়া হয়েছিলো ভিন্ন মতাদর্শের ৩ সংগঠনকে। সংগঠনের প্রধানরা বিএনপি-জামায়াত জোট সমর্থক। পরিবেশনা ও বিষয়বস্তু প্রমাণ করেছে তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ। অন্যদিকে ময়মনসিংহের বটবৃক্ষ আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রাণপুরুষ আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের প্রথম জানাযার দিন (২৮ আগস্ট) এবং দ্বিতীয় জানাযা ও দাফনের আগে (২৯ আগস্ট) ফেসবুক লাইভে গানবাজনা করার অভিযোগ রয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের একাংশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় শোকাচ্ছন্ন নগরীর মানুষ ফুঁসে ওঠেন। পরে নিজেদের অপকর্ম আড়াল করার জন্য তারা লাইভের ক্যাপশন পাল্টান। শেষ পর্যন্ত লাইভ ডিলিট ও অনলিমী করেন। ময়মনসিংহের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দ্বন্দ্বের বিষয়ে জেলা নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নূরুল আমিন কালাম রবিবার দৈনিক জাগ্রত বাংলাকে বলেন, স্বাধীনতার সপক্ষের কোনো সংগঠনে বিএনপি-জামায়াত জোটের সমর্থক থাকতে পারেন না। ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ ইকরামুল হক টিটু বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। স্বাধীনতার সপক্ষের ও প্রগতিশীল কোনো সংগঠনে বিএনপি-জামায়াতের ঠাঁই হতে পারে না। বিষয়টি শপথ ও গঠনতন্ত্র বিরোধী।

জানা যায়, ময়মনসিংহের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দ্বন্দ্ব লাগানোদের একজন ৫ বছরের অধিক সময় জেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা ও তার স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন।  এ সুযোগে তিনি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিরোধ সৃষ্টি করে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন। ২ মাস আগে যোগ দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের আরেক শীর্ষ নেতা ও তার স্ত্রীর গ্রুপে। পুরষ্কার হিসেবে বাগিয়ে নিয়েছেন আওয়ামী পন্থী সাংস্কৃতিক সংগঠনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার একাংশের সাধারণ সম্পাদকের পদ। ৭৩ সদস্যের কমিটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ দেওয়া হয়েছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বুঝেন না এবং কখনো জড়িত ছিলেন না এমন ব্যক্তিদের। তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া ও মেধাক্রম না করায় হাস্যরস্য সৃষ্টি হয়। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে। জেলার সদস্য সংখ্যা ৮১ ও মহানগরের ৭৩। পার্থক্য ৮ জনের। জেলায় সহ-সভাপতি ৯, সাধারণ সম্পাদকসহ সম্পাদক মণ্ডলি ২৫ ও কার্যকরী সদস্য ৪৬ জন। মহানগরে সহ-সভাপতি ১৪, সাধারণ সম্পাদকসহ সম্পাদক মণ্ডলি ৩১ ও কার্যকরী সদস্য ২৭ জন। একই সংগঠনের কমিটির ২ ধরণের ফরমেট। মহানগর কমিটির সম্পাদক মণ্ডলিতে জেলার চেয়ে ৬ জন বেশি ও জেলার চেয়ে মহানগর কমিটিতে ১৯ জন সদস্য কম। গঠনতন্ত্র না মেনে মহানগরের সম্পাদক মণ্ডলিতে সৃষ্টি করা হয়েছে একটি সাংগঠনিক সম্পাদকসহ ৯টি সহ-সম্পাদকের পদ। জেলা কমিটিতে একটি সহ-সাধারণ সম্পাদকসহ আইন বিষয়ক, কৃষি বিষয়ক, চলচ্চিত্র বিষয়ক ও যুব বিষয়ক সম্পাদকের পদ রাখা হয়েছে। অথচ মহানগর কমিটিতে এই পদগুলো রাখা হয়নি। এভাবেই হাস্যরস্যের মধ্য দিয়ে চলছে ময়মনসিংহের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গন।




  • সর্বশেষ - মহানগর