, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০ অনলাইন সংস্করণ

অভয়ারণ্য ময়মনসিংহ নগরীর জয়নুল উদ্যান, ঘটছে হত্যাকাণ্ড : প্রতিদিন বসে অপরাধীদের হাট

  শাহ মোহাম্মদ রনি

  প্রকাশ : 

অভয়ারণ্য ময়মনসিংহ নগরীর জয়নুল উদ্যান, ঘটছে হত্যাকাণ্ড : প্রতিদিন বসে অপরাধীদের হাট
অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে ময়মনসিংহ নগরীর নয়নাভিরাম জয়নুল উদ্যান। ঘটছে হত্যাকাণ্ড ও মারামারির অহরহ ঘটনা। অপরাধীদের হাট বসে প্রতিদিন সকাল-বিকাল। অনেকটাই যেকোনো কারাগারের ‘কেইস টেবিল’ এর মতো। সন্ধ্যার পর থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত চলে প্রেমিক-প্রেমিকা ও পরকীয়ার নায়ক-নায়িকাদের বেলেল্লাপনা এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ড। প্রকাশ্যে মাদক বেচা-কেনার পাশাপাশি শহর রক্ষা বাঁধের নিচে রাতভর চলে পতিতাবৃত্তি। সব মিলিয়ে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের দৃষ্টিনন্দন এই পার্ক ও ব্রহ্মপুত্র নদের পাড় ঘিরে নির্দিধায় চলে যতসব অনৈতিক কারবার। ঢিলেঢালা পুলিশী তৎপরতা এবং অপরাধীরা সবাই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কোনো না কোনো গ্রুপের সমর্থক হওয়ায় পাড় পেয়ে যায়। পার্কে দর্শনার্থী আগমনের নির্দিষ্ট কোনো সময় না থাকায় পরিস্থিতি দিনদিন খারাপ হচ্ছে। দেশের অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনের পার্কে দর্শনার্থী আগমনের সময় বেঁধে দেওয়ায় সেখানে অপরাধ প্রবণতা অনেকটাই কম। ওই সব পার্কে সীমানা প্রাচীর, প্রবেশ ও চলাফেরার ক্ষেত্রে অনেক কড়াকড়ি রয়েছে। ময়মনসিংহ নগরীর নয়নাভিরাম এই পার্কের নিরাপত্তা একেবারেই ঢিলেঢালা। এ কারণে সুযোগ নিচ্ছে একাধিক অপরাধী চক্র ও ভিন্ন চরিত্রের দর্শনার্থীরা।
জানা যায়, পুলিশ শুক্রবার সকালে জয়নুল উদ্যান পার্কের জয়নুল আবেদীন ভাস্কর্যের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড় থেকে হাত-পা ও মুখ বাঁধা মিশুক চালক হাসেম মিয়ার (২৯) রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে। অপরাধীরা বৃহস্পতিবার রাতের যেকোনো সময় হাত-পা বেঁধে মৃত্যু নিশ্চিত করার পর লাশ ফেলে রাখে। যেকোনো দ্বন্দ্বের জেরে হাসেম হত্যার শিকার হন। পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা বৃহস্পতিবার রাতে তাকে ঘটনাস্থলে এনে হত্যা করে। হাসেম রাত সাড়ে ৮ টায় নগরীর আকুয়া চুকাইতলার ভাড়া বাসার কাছ থেকে মিশুক নিয়ে বের হন। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বড় ভাই মোঃ লীলু মিয়া বাদি হয়ে শনিবার কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। তাদের গ্রামের বাড়ি সদরের দাপুনিয়া কলাপাড়ায়। মামলায় অজ্ঞাতদের আসামি করা হয়েছে। রবিবার রাতে এ খবর লেখার সময় পর্যন্ত পুলিশ আসামিদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন দৈনিক জাগ্রত বাংলা’কে জানিয়েছেন। সূত্র মতে, জয়নুল উদ্যান কেন্দ্রিক ঘাপটি মেরে থাকা অপরাধীরা প্রায়ই প্রতিপক্ষের সাথে মারামারিতে লিপ্ত হয়ে পার্কের পরিবেশ নষ্ট করে। পরিস্থিতি অনেক সময় হত্যাকাণ্ডে মোড় নেয়। হত্যার পর লাশ ফেলে রাখা হয় শহর রক্ষা বাঁধের নিচে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ের বিভিন্ন স্থানে। অনেক সময় লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোঃ ইকরামুল হক টিটু ২০১৭ সালে বাঙলা ১৪২৩ নববর্ষের দিন নগরবাসীকে উপহার দেন নয়নাভিরাম জয়নুল উদ্যান। মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য নগরবাসীর একমাত্র ভরসা জয়নুল উদ্যান। আর এই পার্ককে অভয়ারণ্য বানিয়ে ফেলেছে সংঘবদ্ধ কয়েকটি অপরাধী চক্র। এদের সরাসরি শেল্টার দেন এক শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা। তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ডে পুলিশ বাঁধা দিলেই মোবাইল ফোনে কল আসে প্রিয় নেতা ও ভাইদের। ট্যুরিস্ট পুলিশ ও ২ নম্বর ফাঁড়ি পুলিশ পার্কটিতে তৎপর থাকলেও অপরাধীরা বিরদর্পে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়। সন্ধ্যার পর পাল্টে যায় আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের পেছনের অংশ থেকে পার্কের শেষ পয়েন্ট জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা পর্যন্ত। বিভিন্ন ধরণের শতাধিক অবৈধ খাবার দোকান এবং নারী উদ্যোক্তাদের নামে পরিচালিত পুরুষ নিয়ন্ত্রিত ফুড পার্কের দোকানগুলো খোলা থাকে অনেক রাত পর্যন্ত। এর সুযোগ নেয় অপরাধী চক্র ছাড়াও ভিন্ন চরিত্রের দর্শনার্থীরা। উদ্ভট পরিবেশ সৃষ্টি হয় পার্ক ও ব্রহ্মপুত্র নদের পাড় পর্যন্ত। ভদ্রলোকজনক তাদের পরিবার নিয়ে চলাচল করতে হিমশিম খান। হেনস্থা হন অনেক প্রেমিক-প্রেমিকা। জানাজানি হওয়ার ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করেন না। রাজনীতি, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পদ দেওয়ার কথা বলে নগরীর চিহ্নিত অনেকেই সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত নারী নিয়ে আড্ডা দেন পার্কের বিভিন্ন পয়েন্টে। এ নিয়ে প্রায়ই ঘটে অনাকাঙ্খিত ঘটনা। পরিবেশ ও গাছের বারোটা বাজিয়ে বসানো দোকান থেকে সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশের নামে প্রতিদিন ২০ হাজার টাকা চাঁদা তুলেন ৩ ব্যক্তি। পার্কের একাংশে সীমানা প্রাচীর না থাকায় বিকট শব্দে ওয়াকওয়ে, ফাঁকা জায়গা ও শহর রক্ষা বাঁধ দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে একদল বখাটে।
জানা যায়, ময়মনসিংহ নগরীর অধিকাংশ অপরাধী সকাল, বিকাল ও রাতে দলবল নিয়ে জয়নুল উদ্যানে আড্ডা দেয়। এলাকায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও ভাগবাটোয়ারা, জমি বিক্রি ও বাড়ি নির্মাণ থেকে চাঁদা আদায় এবং আধিপত্য বিস্তারের মাস্টারপ্ল্যান করা হয় এই পার্কে বসে। এখান থেকে সব ঠিক করে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে হানা দেওয়া হয় নির্দিষ্ট এলাকায়। সেখান থেকে ফিরে অপরাধীরা আবারো বৈঠকে বসে। এভাবেই গভীর রাত পর্যন্ত পার্কের বিভিন্ন পয়েন্ট তাদের দখলে থাকে। কয়েকটি দোকানে এদের জন্য নির্দিষ্ট চেয়ার ও বেঞ্চ রয়েছে। সূত্র মতে, জয়নুল উদ্যান ঘিরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং অফিস থাকলেও অপরাধীরা এ সবের তোয়াক্কা করে না। ডিজিএফআই’র রিজিওন্যাল অফিস, বিচারকদের বাস ভবন, গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের বাস ভবন, সার্কিট হাউজ ও আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস থাকলেও তাদের চোখেই পড়ে না। অপরাধ বিশ্লেষকরা জানান, ব্রহ্মপুত্রের পাড় হয়ে পার্কটির পুরো অংশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ এবং সন্ধ্যার পর দর্শনার্থীদের অবস্থান বন্ধ থাকলে অপরাধ প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে। মসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ইউসুফ আলী রবিবার দৈনিক জাগ্রত বাংলা‘কে বলেন, জয়নুল উদ্যানের বিষয়টি আমাদের মাথায় রয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

  • সর্বশেষ - মহানগর