, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ অনলাইন সংস্করণ

বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জ সিন্ডিকেট

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জ সিন্ডিকেট

রোজার আগে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বাজার সিন্ডিকেট। ডলার সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে দরবৃদ্ধি, এলসি সংকট ইত্যাদি সমস্যা তুলে ধরে তারা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। চাল, চিনি, ডাল, ছোলা, খেজুর, মাংস, ডিম, পিঁয়াজ, ফল, কাঁচা সবজিসহ এমন কোনো পণ্য নেই যেখানে সিন্ডিকেটের হাত পড়েনি। এমনকি মূল্যসংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও সরকারি সংস্থাগুলোকে প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার।

সূত্র জানান, জাতীয় নির্বাচনের আগে একটি চক্র অহেতুক পণ্যের দাম বাড়াতে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে বলে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। এখন রমজানের আগে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বাজার সিন্ডিকেট। নানা অজুহাতে তারা দাম বাড়াচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধির সুযোগের অপেক্ষায় শিয়ালের মতো ওত পেতে থাকে এ সিন্ডিকেট।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সক্রিয় এ সিন্ডিকেট প্রতিদিন সকালে মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে বিভিন্ন পাইকারি বাজারে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে। নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে না। অনেক সময় হুমকিধমকিও দেওয়া হয়। গরুর মাংস কম দামে বিক্রি করায় খুনের ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া আলু, পিঁয়াজ, ডিমসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মোবাইল মেসেজে নির্ধারণ করে দেওয়ার তথ্য সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র জানান, শুল্ক হ্রাসের পর যখন চিনির দাম কমানোর বিষয়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে, তখনই শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) সরকারি কলের চিনির দাম একলাফে কেজিতে ২৫ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। গত বৃহস্পতিবার দাম বৃদ্ধির ঘোষণার পর ওই দিন রাতে এ সিদ্ধান্ত বাতিলের কথা বলা হলেও ততক্ষণে চিনির বাজারে দেখা দেয় অস্থিরতা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় না করে সরকারি সংস্থার দাম বাড়ানোর ঘোষণার কারণেই সুযোগ নেন বেসরকারি মিল মালিকরা।

রাজধানীর বৃহত্তম পাইকারি মোকাম মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি গোলাম মাওলা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় রমজানে পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো ও দাম সহনীয় রাখার বিষয়ে ব্যবসায়ীরা প্রতিশ্রুতি দেন। সভা শেষে এসেই শুনি শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংস্থা বিএসএফআইসি সরকারি চিনির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ নেন চিনি পরিশোধনকারী মিল মালিকরা। তারা পণ্যটির দাম বাড়িয়ে দেন। পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি চিনি ১৬০ টাকায় উঠে যায়।’ মৌলভীবাজারের এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘ভারতে যেখানে চিনির কেজি ৪০ টাকা, সেখানে দেশে দেড় শ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে!’ তার অভিযোগ, চিনি পরিশোধনকারী চার-পাঁচটি কোম্পানি সিন্ডিকেট করে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।

শুধু কি চিনি! ডিম ও মুরগির বাজারও চলে গেছে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খামার থেকে ভোক্তার হাত পর্যন্ত পৌঁছাতে মুরগি ও ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণে অন্তত পাঁচ-ছয়টি সিন্ডিকেট জড়িত। মূল্য নির্ধারণে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন, পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ), পোলট্রি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশন, এগ প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন, ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএবি)। একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে গরুর মাংসের দাম নিয়ন্ত্রণেও। নির্বাচনের আগে কিছু ব্যবসায়ী মাংসের দাম কমিয়ে বিক্রির ঘোষণা দিলেও এদের নেতৃত্বদানকারী সংগঠনগুলো তাতে বাধা হয়ে ওঠে। এসব সংস্থার প্রতিনিধি ডেকে সরকারি সংস্থাগুলো দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে তখন তারা একে অন্যের কাঁধে দোষ চাপিয়ে দেয়। সভায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। গত ডিসেম্বরে মাংসের দাম নিয়ে ডাকা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের এক সভায় মহাপরিচালকের উপস্থিতিতে এক অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি আরেক অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধির ওপর চড়াও হয়েছিল। সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে আলু, পিঁয়াজসহ কাঁচা সবজি, ফলমূল ও খেজুরের বাজারেও। রোজাদার ব্যক্তিরা শুকনো খেজুর দিয়ে ইফতার করতে পছন্দ করেন বলে এ সময় দেশে পণ্যটির চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। আর এ সুযোগে দ্বিগুণ এমনকি তিন গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয় পণ্যটির দাম। সম্প্রতি এনবিআর খেজুরের শুল্ক হ্রাসের ঘোষণা দিলেও এখনো একটু ভালো মানের খেজুর কিনতে গেলে হাজার টাকার বেশি গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। আজওয়া বা আম্বর জাতের খেজুরে পাইকারি মূল্যের তুলনায় কেজিপ্রতি ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকা বেশি মুনাফা করার অভিযোগও রয়েছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পেছনে অন্যান্য কারণের পাশাপাশি সিন্ডিকেট একটা বড় কারণ। আমাদের দেশে ব্যবসায়ীরা সব সময় দাম বাড়ানোর সুযোগ খোঁজে। যে কোনো অসিলায় দাম বাড়িয়ে দেয়। আমরা দেখলাম, ভারত কর্তৃক পিঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার ঘোষণার পর এক দিনে পণ্যটির দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। এ সুযোগ ছোট, বড়, মাঝারি সব ব্যবসায়ীই নিয়েছেন। তবে সরকারকে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অন্য বিষয়গুলোয়ও নজর দিতে হবে। পণ্যের দাম বাড়লে ভোক্তার আয় বৃদ্ধির সুযোগ করে দিতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিতে হবে। তা হলেই দেশে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাবে।’

  • সর্বশেষ - অর্থ-বাণিজ্য