, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

ভয়

  সাহিত্য ডেস্ক

  প্রকাশ : 

ভয়

শায়লা ঘুম ভাঙার পরও বিছানায় কিছুটা সময় গড়াগড়ি না করে, এলোমেলো চিন্তা না করে বিছানা ছাড়ে না। সেই ছোট বেলা থেকে এটা তার স্বভাবের সাথে মিলেমিশে আছে। আজও ঘুম ভাঙার পর শুয়ে শুয়ে ভাবছে, এবার বিজয় দিবসে একটা লাইভ করবে। লাইভটা করবে চন্দ্রিমা উদ্যানে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু কথা, কিছু কবিতা আবৃত্তি এই হবে লাইভ এর বিষয়। হঠাৎ, পাশের ডাইনিং রুম থেকে শুনতে পেল, 'আমার বুকে লাগে খিল, আমার চামড়া হইসে ঢিল'। সুরে সুরে বলছে শায়লার ফুপু। শায়লার ফুপু রহিমা বেগমের ধারণা শায়লাদের বাড়িতে একটা জ্বিন মাঝে মাঝে আসে, ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ায়। তিনি মাঝে মধ্যে ছাদে কেউ একজন হেঁটে বেড়ানোর শব্দ শুনতে পান। তার এই কথাটি বাড়ির কেউ বিশ্বাস করে না।

একদিন এক ঘটনা ঘটার পর বাড়ির অর্ধেক লোক বিশ্বাস করতে লাগলো, রহিমা বেগম ঠিকই বলেছে, এই বাড়িতে একটা জ্বিন আসে মাঝে মাঝে। বিশেষ করে রাতে, ঠিক তিনটার সময়। এরপর একই ঘটনা আরেক দিন রাত ঠিক তিনটার সময় যখন ঘটলো, বাড়ির নব্বই ভাগ লোক এবার বিশ্বাস করতে লাগলো হয় জ্বিন নয় ভূত আছে এই বাড়িতে। শায়লা তো কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না।

 ‘প্রথমে শায়লা একটু বিষম খেলো। কীভাবে কোথা থেকে এলো এসব কাঁচের টুকরো! চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। নাহ্, কোনো বাড়ির জানালার গ্লাস তো ভাঙা দেখছি না। ভাবতে ভাবতে ওর মাথাটা শূন্য মনে হতে লাগলো।’ 

এবার দুবার ঘটে যাওয়া ঘটনাটি বলি। একবার রাত তিনটার দিকে শাহনাজের ঘুম ভাঙলো কাঁচ ভাঙার শব্দে। সে স্পষ্ট শুনতে পেলো কাঁচ ভেঙে ঝুর ঝুর করে পড়ছে। এটা প্রায় এক মিনিটের মতো স্থায়ী হলো। শাহনাজ ভয় পেয়ে শায়লার বাবাকে ডেকে তুললো। শোনো, আমি কাঁচ ভেঙে ঝুর ঝুর করে পড়ার শব্দ শুনলাম। মনে হয় তিন তলা থেকে শব্দটা আসলো। শাহেদ কি রাগ করে কিছু ভাঙলো? কিন্তু, এতো রাতেই বা কেন? শায়লার বাবা আনিস শাহনাজকে বললো, আরে ধুর, তুমি কাঁচ টাচ ভাঙার স্বপ্ন দেখসো।

এবারের বন্যায় তোমার স্কুলের একটা ভবন ভেঙে পড়লো না? ওই জন্য এসব ভাঙাভাঙির স্বপ্ন। যখন দেখবা নতুন ভবন তৈরি হইসে, তখন শুধু জোড়াজুড়ির স্বপ্ন দেখবা। এবার ঘুমাও। শাহনাজ বললো, আমি একটু তিতলিকে ফোন করি। শুনি কী হলো। আরে কিছু হলে তো ওই তোমাকে ফোন দিত, রেগে বললেন আনিস। আচ্ছা, তাহলে শায়লার ঘরে গিয়ে শায়লাকে দেখে আসি।

শায়লা, শায়লা, এই শায়লা, কীরে কিছু শুনতে পেয়েছিস? শায়লা চোখ ডলতে ডলতে বললো, কী শুনবো? কাঁচ... না মানে, আচ্ছা, তুই ঘুমা।

শাহনাজের তেমন ঘুম হলো না। ভোরে উঠে নামাজ পড়ে নাশতা বানিয়ে আনিসকে নাশতা দিয়ে কোনো কথা না বলে তিনতলায় উঠে গেল। তিতলিকে জিগ্যেস করলো, গতকাল রাতে তিনটার দিকে তোরা কি জেগে ছিলি? ঝগড়া হইসিলো? না তো, মা। কেন কী হইসে? না, মানে কেমন কাঁচ ভেঙে ঝুর ঝুর করে পড়ার শব্দ শুনলাম। ও মা! কী বলো, আমিও তো শুনলাম। আমি তো ভাবছিলাম স্বপ্নে দেখসি। এখন তো ভয় লাগতেসে মা। রহিমা ফুপু কি শুনসে? একটু জিগ্যেস করি তো। ফুপু, কাল রাতে কি কিছু শুনসেন? হ, কাঁচগুলা ভাইঙ্গা ফালাইলো উনি। ছাদের উপর হাঁটার শব্দও শুনসি। চল, ছাদে গিয়া কাঁচগুলা দেইখা আসি। মা, ফুপু এইসব কী বলে? আমার তো ভয় লাগতেছে। আমি যাবো না। তোমরা গিয়া দেখো। শাহেদ জানলে ওর তো মাথা খারাপ হয়ে যাবে। ও এমনিতেই যে ভয় পায়।

ছাদের উপর গিয়ে শাহনাজ ও রহিমা কিছুই পেলো না। কাঁচের কোনো কোনাটাও নেই। রহিমা বেগম শাহনাজকে সান্ত্বনা দেবার ছলে বললো, এই জ্বিন হইলো ভালো জ্বিন। কোনো ক্ষতি কইরবো না। কী জানি, বুঝতে পারছি না। একটা আতঙ্কের ঢেউ শাহনাজের বুকের সমুদ্র বেয়ে চলে গেল।

শায়লা এমবিবিএস পাস করেছে। ইন্টার্নিশিপ শেষে আলট্রাসনোগ্রাফি এর উপর ডিপ্লোমা করছে। পাশাপাশি কবিতার নেশা ওর। কবিতা আবৃত্তি করে, কবিতা লেখে। এইসব ভুত-পেত একদমই বিশ্বাস করে না। জ্বিন সম্পর্কে ধারণা নেই তেমন। শুনেছে আকাশের কোনো এক স্তরে তারা থাকে। কখনো মানুষের বেশ ধরে মানুষের সাথে কথা বলে এই পৃথিবীতে এসে। এসব নিয়ে ও ভাবে না। যে যেভাবে বিশ্বাস করে করুক। কারো ক্ষতি তো হচ্ছে না। কিন্তু, তাই বলে আমাদের বাড়িতে জ্বিন, এটা ভাবা যায় না!

আজ সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। চারিদিক কেমন নিস্তব্ধ হয়ে আছে। একে তো করোনার কারণে মানুষের সমাগম এমনিতেই কমেছে, তার উপর শ্রাবণের ধারা নেমেছে সহযোগী হয়ে। শায়লা মেঘ, বৃষ্টি, জল, আকাশ দেখলে আনমনা হয়ে যায়। বুকের গভীরে ঠিক কোথায় যেন হৃদয় বলে যে একটা কিছু আছে, কথা বলে নিশ্চুপে তাদের সাথে। এই যে মেঘ আমাকে নিয়ে যাও, ওই পাহাড়ে, বৃষ্টি হয়ে আমিও নামি আবার, মিশে যাই মাটির বুকে।

রাত তিনটার দিকে আবার কাঁচ ভেঙে পড়ার শব্দ। আজ এতো জোরে শব্দ হলো ঠিক যেন বজ্রপাত! আজ সবার ঘুম ভেঙে গেল। শায়লা এবার বুঝলো কিছু তো একটা হয়েছে। তবে, ও বুঝতে পারছে এটা জ্বিন বা ভূতের কাজ না। প্রকৃতির কাজ। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে শায়লা এর সন্ধানে বের হলো। গত এক বছর হলো মা, ফুপু এ নিয়ে কত যে কাহিনী করেছে তার একটা বিহিত করতে হবে। খুঁজতে খুঁজতে বাড়ির নিচে এসে গেট থেকে বেরিয়ে ডান দিকে চোখ যেতেই দেখলো ছোট বড় ভাঙা ভাঙা কাঁচের টুকরোতে পুরো রাস্তা ঢেকে আছে।

প্রথমে শায়লা একটু বিষম খেলো। কীভাবে কোথা থেকে এলো এসব কাঁচের টুকরো! চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। নাহ্, কোনো বাড়ির জানালার গ্লাস তো ভাঙা দেখছি না। ভাবতে ভাবতে ওর মাথাটা শূন্য মনে হতে লাগলো। এবার বুঝি আমাকে ভূতে বিশ্বাস করতে হবে! অথবা, রহিমা ফুপুর কথা। চারদিক ঘুরে ঘুরে কিছু না পেয়ে এবার ছাদে ওঠা শুরু করলো ও। একটু তো ভয় ভয় লাগছে! একা একা চার তলার ছাদে ওঠা। কাউকে সাথে নিতে চাচ্ছে না। বাড়ির সবাই জানে, শায়লা এই বাড়ির একমাত্র মানুষ এখন যে জ্বিন ভুতের ভয় করে না। দোতলা পেরিয়ে তিন তলায় ওঠার সময়ই চোখ গেল সিড়ির বিপরীতে থাকা লম্বা ভেন্টিলেটরের দিকে। সেখানে চারটা গ্লাসের মধ্যে তিনটি গ্লাস নেই। ফাঁকা। কিন্তু, এই কাঁচগুলো পুরো রাস্তায় কীভাবে ছড়ালো! এরপর ভেন্টিলেটরের কাছে গিয়ে নিচে তাকাতেই খেয়াল করলো বাড়ির কাছাকাছি একতলা টিনশেড এর লম্বা বাড়িটা। এবার ওর বুঝতে বাকি রইলো না। ঝড় বৃষ্টির রাত ছিল গতরাত। বাতাসের তীব্র বেগে তিন তলা এবং চারতলা থেকে কাঁচের বড় গ্লাসগুলোর দুই তিনটা ভেন্টিলেটর থেকে খসে টিনের চালের উপর পড়ে বিজ্ঞানের সূত্র অনুসরণ করে ছিটকে ছিটকে রাস্তায় পড়েছে।

শায়লা কেবল মৃত্যুকে ভয় পায়। আর কোনো কিছুতে ওর ভয় নেই। এবার তা আবার প্রমাণিত হলো।

  • সর্বশেষ - সাহিত্য