, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

অপেক্ষা

  সাহিত্য ডেস্ক

  প্রকাশ : 

অপেক্ষা

ক্ষেতের ধান পাকতে শুরু করেছে। সোনালি ধানের শীষে মৃদু বাতাস দোলা দিয়ে যাচ্ছে। সে দৃশ্য নিশ্চয়ই নান্দনিকতার বার্তা নিয়ে এসেছে। গ্রামীণ আবহে বালকদের চঞ্চলতা স্বাভাবিক বিষয়। গোধূলিলগ্নে গ্রামের বালকগুলি নিজেদের বাড়িতে ফেরার পথ ধরেছে। তারা মূলত প্রতিদিন বিকালজুড়ে গ্রামের এক কোণে মোছোবাবুর মাঠটিতে খেলা করে। মাঠটির নামকরণেরও গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস রয়েছে। লোকের মুখে শোনা যায়, গ্রামের মাঠটিতে বড় বাবু মাঘিপূর্ণিমা রাতে মেছোবাঘের লড়াইয়ের আয়োজন করতেন। তবে বিষয়টি কেমন জানি আজগুবে মনে হয়। কেননা এ খেলা গ্রামের কেউ দেখেছে এমনটি শোনা যায়নি। তারপরও নামের সাথে সাদৃশ্য থাকায় বিষয়টি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। মাঠের জায়গাটি মূলত বাবুদের। মাঠের একটু অদূরে রয়েছে বাবুদের পরিত্যক্ত বাগান বাড়ি। বাড়ি থাকলেও এ গ্রামে তাদের কোনো বংশধর নেই। না থাকারও একটি ইতিহাস রয়েছে।


প্রতিদিনকার মতো আজও বালকেরা বাড়ি ফিরছে। তাদের বাড়ি ফেরার একমাত্র পথ বাগান বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গেছে গ্রামের মূল কেন্দ্রের দিকে। এ বাগান বাড়ি নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত অনেক ভৌতিক গল্প রয়েছে। অনেকের রয়েছে কৌতূহল। তবে গ্রামবাসী ভয়ে এর আশপাশে ভেড়ে না। প্রচলিত আছে যে, এখানে গ্রামের অসহায় মানুষদের এনে বাড়ির একটি কক্ষে নির্যাতন করা হতো। বাবুদের গ্রামের কোনো যুবতিকে পছন্দ হলে তুলে আনা হতো বাগান বাড়িতে। এরপর ভোগের পণ্য হিসেবে ব্যবহার করতো তারা। ধর্ষণের পর অনেক সময় মেরে ফেলা হতো। বাবুরা ছিলেন আশপাশের কয়েক গ্রমের জমিদার। সুতরাং কেউ তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস পেতো না। এ ছাড়া নিয়মিত রাতে নৃত্য বা মদের আসর ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। রঙিন পানি পান করে রঙিন জগতের কল্পনায় সময় পার করতো তারা। জমিদারীর অর্থ ভোগ বিলাসে খরচ করতো। বাড়ির কোনো নারী এর প্রতিবাদ করলে তার পরিণতি ছিল অতি নির্মম। ফলে নিরবে সহ্য করতো সবাই।


যদিও ইতিহাস বলে, এমন অত্যাচারীরা কখনো টিকে থাকেনি। বাবুদের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। এক ভয়ানক রোগে তাদের পরিবারে মৃত্যুর মিছিল নেমে আসে। নামকরা ডাক্তার, কবিরাজ এনেও অজানা রোগটি থেকে প্রতিকার পাওয়া যায়নি। জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে উপন্যাসে ওলাবিবির আগমনের মতো ঘটনা বলা যায়। যাকে ধরে; তাকে ছাড়ে না। রোগটি অনেকটা তাদের পরিবারে মহামারী রূপ ধারণ করে। এমন করুণ পরিণতি এলাকার মানুষ কখনো কল্পনা করেনি। তবে বাস্তবে এমন করুণ পরিণতি হয়েছিল বলে শোনা যায়। লাশের স্তূপ পড়েছিল অভিশপ্ত এ বাড়িতে। রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে অনেকে গ্রাম ছেড়েছিল। আর ভয়ে এদিকে ভিড়তো না কেউ। লাশের প্রকট দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে গ্রামের কিছু মানুষ মিলে মাটি চাপা দেয়। তারপর থেকে এ বাড়িমুখী হয়নি কেউ কখনো।


বালকেরা দলবেঁধে নিজেদের বাড়িতে ফেরার সময় কেন জানি তাদের আজ ইচ্ছা হলো বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করবে। যদিও প্রায়ই তাদের পরিকল্পনা হয় বাগান বাড়ির ভেতর প্রবেশ করার। তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি এতদিনে। পরিকল্পনা অধরা রয়ে যায়, কল্পনায় স্থান পায় পরিকল্পনা। যদিও আজ তারা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে। কিশোর বয়সের মানসিক শক্তি অনেক বেশি থাকে। ফলে ঝুঁকি নিতে পারে। তাদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।


সুজন এদের মধ্যে সবচেয়ে ভীতু প্রকৃতির। ফলে বন্ধুদের সিদ্ধান্ত মেনে সে বাড়ির মধ্যে যেতে রাজি নয়। সুজনের দেখাদেখি মমিন, মইনুল, সানিফ, মামুন, জাকারিয়া ও নেয়ামুল তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টে না যাওয়ার মত পোষণ করলো। প্রচলিত গল্পের বাইরে বাগান বাড়িতে প্রবেশে ভয় পাওয়ার অন্য কারণও আছে। বছর তিনেক আগে গ্রামের জুয়েল ভাই এ বাড়িতে প্রবেশ করে আর ফিরে আসেননি। তার প্রবেশের ঘটনা এলাকার সবাই জানে। সাহস তার জীবনে করুণ পরিণতি নিয়ে এসেছে। যা আরও বেশি ভয় এবং কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে বাড়িটিকে ঘিরে। ফলে এলাকার মানুষ বাগান বাড়ির নাম শুনলেই ভয়ে আঁতকে ওঠে।


জুয়েল ভাই আমাদের বান্ধবী মুনিয়াকে পছন্দ করতেন। নিয়মিত তাকে প্রেম নিবেদনের জন্য স্কুলের সামনে ছুটি হলে অপেক্ষা করতেন। মুনিয়া যদিও পাত্তা দিতেন না তাকে। মুনিয়া দেখতে অনেক লাজুক, শ্যামলা বর্ণের হলেও তার সৌন্দর্য আকর্ষণ করবে যে কাউকে। বলা যায় প্রথম দেখায় প্রেমে পড়ার মতো। সবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি তখন। তবে মুনিয়ার উচ্চতা দেখে সেটি বোঝা যাবে না। লাজুক সে চাহনীতে জুয়েল ভাই মুগ্ধ হয়ে ঘুরতেন তাকে পাওয়ার বাসনায়। মুনিয়া একদিন অনেকটা বিরক্ত হয়ে জুয়েল ভাই কে বললেন, ‘আপনার সাথে আমি প্রেম করতে পারি তবে একটি শর্ত আছে।’ জুয়েল ভাই মুনিয়াকে পেতে যেকোন শর্ত মানতে প্রস্তুত। সাত সমুদ্র তের নদী পার হতেও তিনি একপায়ে রাজি। মুনিয়া বললো, ‘আপনি যদি একরাত বাগান বাড়িতে কাটাতে পারেন। তাহলে আমি আপনার সাথে সম্পর্কে জড়াবো।’ যেই কথা সেই কাজ। প্রেয়সীকে পাওয়ার জন্য এ শর্ত তার কাছে কিছুই নয়। ভাই শর্ত পূরণে বাগান বাড়িতে প্রবেশ করলেন, যা তার জন্য কাল হয়ে গেল। একরাত কাটাতে গিয়ে অনেক রাত কাটলেও তিনি আর ফিরে এলেন না।


জুয়েল ভাই এই শর্ত পূরণে রাজি হবেন কিশোরী মেয়েটি হয়তো তা বুঝতে পারেনি। ভাই না ফেরার ফলে মুনিয়া কিছুদিন মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে যদিও স্বাভাবিক হয়েছে। তবে এক অপরাধীর কাঠগড়ায় সে, অনেকটা অস্বস্তিতে তার সময় কাটে। অন্যদিকে জুয়েল ভাইয়ের বাবা-মা তাদের একমাত্র ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় প্রতিদিন সকালে বাগান বাড়ির সামনে এসে বসে থাকতেন। শোকে তার বাবা মারা যান বছর দুই আগে, মাও পাগলপ্রায়। এখন যদিও তার মা এখানে আসেন না। তবে প্রলাপ করে দিন কাটে তার।


প্রচলিত আছে, রাত হলে না-কি এ বাড়ি থেকে অনেকের চিৎকারের শব্দ শোনা যায়। সে শব্দে কেউবা বলছে ‘বাঁচাও’ আবার অনেকে দিচ্ছে অভিশাপ। ধারণা করা হয়, মানুষের সে অভিশাপে বাবুদের বংশ হয়েছে নির্বংশ। অনেকে বলে, বাবুরা কান্না করে ক্ষমা চান গ্রামবাসীর কাছে। তবে এ আওয়াজ গ্রামবাসী নিজ কানে শোনেনি কখনো। গল্প আর প্রবাদের ভয়ে মানুষের বিচরণ না থাকায় বাড়িটি ঘিরে জীব-জন্তুর অভয়ারণ্য হয়েছে।


বাগান বাড়িতে প্রবেশে ফরহাদ এবং তৈয়ব সিদ্ধান্তে অবিচল রইল। আজ তারা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করবে। সেটি যেকোনো উপায়ে। এ দু’জনের সাথে মত দিলো আসিফ, শাওন, দুর্জয়, রুবেল, শামিম ও শুভ। তাদের পরিকল্পনা শুধুমাত্র পরিকল্পনাই রয়ে যায়। ফলে আজ তারা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। তবে তারা একটি বিষয়ে একমত হলো, আজকের ঘটনাটি যাই ঘটুক; কেউ অন্য কাউকে বলবে না। তাদের মধ্যে ভীতুগুলো বাগান বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং বাকিরা বাড়ির ভেতর প্রবেশ করবে। এই শর্তে যেই কথা সেই কাজ। আসিফ এবং তৈয়ব প্রথমে প্রবেশ করলো। একে একে অন্যরাও প্রবেশ করলো বাগান বাড়িতে।


সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। তবে এখনো সূর্যের রক্তিম আলো কিছুটা আলো ছড়িয়ে আলো-আঁধারের লুকোচুরি খেলছে। প্রকাণ্ড বটগাছের পাশ দিয়ে কিছুটা ইটের স্তূপও অতিক্রম করে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতে হবে। মূল ফটকে প্রবেশে এর চেয়ে সহজ পথ আর নেই। ফলে এটিকে বেছে নিলো তারা। বাড়ির ভেতর ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়লো বড় বড় দুটি ভাস্কর্য। ভাস্কর্য দুটি লতা-পাতায় অনেকটা ঢেকে গেছে। এ দুটির মধ্যে একটি শাড়ি পরা নারীর এবং অন্যটি পাঞ্জাবি পরে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষের। হয়তো বা ভাস্কর্য দুটি তাদের পূর্বপুরুষদের কারও স্মৃতিফলক হবে।


দ্বিতল বাড়িটি লতাপাতা যেভাবে আঁকড়ে ধরে আছে, সত্যিই যেন ভুতুড়ে পরিবেশ। বাড়িতে প্রবেশের সময় প্রথমে সাহস থাকলেও এখন ভয় ভয় লাগছে সবার। ভাস্কর্য পেরিয়ে আরেকটু ভেতরে প্রবেশ করতেই মশালের আলো চোখে পড়লো সবার, যা তাদের ভীষণ অবাক করলো। এ অন্ধকার পরিত্যক্ত বাড়িতে মশালের আলো কৌতূহলের জন্ম দিলো। কিছুটা সামনে এগোতেই কঙ্কাল এবং কাসার দ্রব্য চোখে পড়লো। একদম সুনসান পরিবেশ। হঠাৎ তৈয়ব কিছুটা বিকৃত প্রাণির ছায়া দেখতে পেলো। অন্যরাও তা খেয়াল করলো। তাদের কাছে রহস্য ঘণিভূত হচ্ছে।


একটি কাঠবিড়ালি তাদের সামনে দিয়ে দৌড় দিতেই সবাই ভয়ে লাফিয়ে উঠলো। এখন তাদের মধ্যে চঞ্চলতা এবং ভয় একইসাথে কাজ করছে। ওদিকে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুরা তাদের নিয়ে আরও বেশি উদ্বিগ্ন। তাদের ভাবনায় তারা জুয়েল ভাইয়ের মতো বন্ধুদের হরিয়ে ফেলবে, না-কি ফিরে পাবে! এই সমীকরণে ব্যস্ত। আসিফ এবং রুবেল মশাল হাতে নিয়ে দ্বিতীয় তলায় ওঠার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল, তাদের অনুসরণ করলো বাকিরা। কারুকার্য খচিত দেয়াল আজও তার শৈল্পিক সৌন্দর্য ধরে রেখেছে। আরেকটু উপরে উঠতেই কিছুটা ভগ্ন বাক্স চোখে পড়লো। অনেকটা ছোট সিন্দুকের মতো। শুভ বাক্সটি তুলতেই কয়েকটি কয়েন বেরিয়ে এলো। এগুলো স্বাভাবিক কয়েন নয়, স্বর্ণমুদ্রা। দেখেই চোখ কপালে সবার। তারা কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। একটু এগোতেই লক্ষ্য করলো কালো আবরণে কিছু একটা এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। একটি নয় সাথে কয়েকটি। ঠিক তখনই একটি বিকট আওয়াজ হলো। সে আওয়াজ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুদের কানে এলো। কিছু সময় পর ভেতরে থাকা বন্ধুদের চিৎকার স্পষ্ট শুনতে পেল। তবে কেন সে চিৎকার তা বোঝার আগেই একটি নীরবতা নেমে এলো। আবারও কিছুটা শব্দ কানে এলো তাদের। তবে এখন শব্দটি অস্পষ্ট হয়ে আসছে। শব্দটি তাদের চিৎকারের না-কি দৌড়াদৌড়ির বা অন্যকিছু তা এখন বোঝার উপায় নেই।


এখন শব্দ আর কানে আসছে না। তাদের মধ্যে ভয় এবং স্নায়ুচাপ কাজ করছে। চোখেমুখে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। সুজন তো পারলে মইনুলকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে। শরীর কাঁপছে তাদের। কান্নাও পাচ্ছে হয়তো। তবে ভয়ে সে কান্নার আওয়াজ বের হচ্ছে না। বাঁদুড় বিচরণের শব্দ এবং চামচিকার আওয়াজ ছাড়া পরিবেশটা বলা যায় পিনপতন নীরবতা। সুজনরা বাড়ির একটু অদূরে দাঁড়িয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে রহস্যের ঘোরটোপে বন্দী। মূল বিষয়টি তাদের কাছে অস্পষ্ট। সময় কাটছে আর ভয়ে ও স্নায়ুচাপে তাদের ঘাম ঝরছে, ঘুটঘুটে অন্ধকার তাদের ঘিরে ধরেছে। বাঁদুড়ের শব্দ আর জোনাকির ডাকে হৃদয় চমকে দিচ্ছে। কী ঘটছে ভেতরে! বা কী করছে বন্ধুরা! এমন প্রশ্ন তাদের মনে। গুমোট পরিবেশে অপেক্ষায় সময় কাটছে তাদের। সে অপেক্ষা বন্ধুদের ফিরে আসার না-কি প্রকৃত রহস্য জানার?


লেখক: সাধারণ সম্পাদক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

  • সর্বশেষ - সাহিত্য