ময়মনসিংহ, , ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা পত্রিকা’য় বাংলাদেশের কবিতা

  সাহিত্য ডেস্ক

  প্রকাশ : 

বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা পত্রিকা’য় বাংলাদেশের কবিতা

আবু আফজাল সালেহ

‘কবিতা’ পত্রিকা কবিদের স্বর- বুদ্ধদেব বসুর মস্তিষ্কের খেলাঘর। তিনি এ পত্রিকা প্রকাশে খুবই যত্নবান ছিলেন। কবিতার বিভিন্ন রূপতত্ত্ব ও অন্যান্য অংশ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। পঁচিশ বছরের অধিক সময়ে ‘কবিতা’ পত্রিকার ১০৪টি সংখ্যা বের হয়। কবিতার ভাঙা-গড়ার কলম চলেছে। এ পত্রিকার প্রায় অর্ধেক লেখা থাকত সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুর। স্বনামে ও বেনামে বিভিন্ন বিষয়ে লিখতেন তিনি। সমসাময়িক সব কবির ওপর আলোচনা করতেন। এছাড়া সাহিত্যবিষয়ক পুরস্কার, বই নিয়েও আলোচনা করতেন। সময় দিয়েছেন পরবর্তী কবিপ্রজন্মদের। তার নিরপেক্ষ আলোচনা ও সমালোচনা উচ্চমার্গে নিয়ে গেছে।


বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় পঞ্চপাণ্ডবের কবিতার পাশাপাশি তিরিশের কবি ও অন্যান্য কবিদের কবিতা ও আলোচনা ছাপা হতো। বোদলেয়ার বা বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন কবির কবিতা অনুবাদ করা হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাও ছাপা হতো। বাংলাদেশের সৈয়দ শামসুল হক ও শামসুর রাহমানের কবিতা প্রায়ই ছাপা হতো- বিশেষ করে শেষের দিকের সংখ্যাগুলোয়। আবুল হোসেন, হুমায়ন কবীর প্রমুখের কবিতা ছাপা হতো। কবিতা পত্রিকায় পঞ্চপাণ্ডব কবির কবিতা বেশি ছাপা হতো। এরমধ্যে জীবনানন্দ দাশের কবিতা বেশি ছাপা হতো বলে মীনাক্ষীর বিভিন্ন সময়ের লেখা থেকে জানা যায়। আর কবিতা পত্রিকার সংখ্যাগুলো দেখে এটির প্রমাণও পাওয়া যায়।


বুদ্ধদেব বসুর কন্যা মীনাক্ষীর ভাষায়, ‘...প্রগতি পত্রিকা থেকেই জীবনানন্দ দাশকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। অনেক সময় কবিতা পত্রিকায় এক সংখ্যাতেই জীবনানন্দের ৭-৮টি পর্যন্ত কবিতা ছাপা হত। কিন্তু অন্য পত্রিকাগুলোতে জীবনানন্দের কবিতা কেউ ছাপাতে চাইতেন না! (আমার বাবা বুদ্ধদেব বসু)। ‘কবিতা’ পত্রিকার সংকলন করার সময় পুরোনো সংখ্যাগুলো পড়তে গিয়ে মীনাক্ষী দেখেছেন এক-এক সংখ্যায় আটটি-দশটি করে জীবনানন্দের কবিতা। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’য় জীবনানন্দের উনিশটি কবিতা, যেখানে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের ষোলোটি এবং পঞ্চ কবির কারোরই ষোলোটির বেশি নয়। মীনাক্ষীর কথায়, ‘আজীবন বাবা ছিলেন জীবনানন্দের পরম সুহৃদ ও উগ্র প্রচারক।’


বাংলাদেশের কবিতা প্রায়ই শেষাংশে ছাপা হতো। বুদ্ধদেব বসুর কবিতা থাকত প্রতিসংখ্যায়। বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ, সমর সেন, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখের পাশাপাশি অল্প পরিচিত ও নতুনদের কবিতাও ছাপা হতো নিয়মিত। প্রতিসংখ্যায় বিদেশি কবিতার অনুবাদ থাকত। আলোচনাও থাকত। বুদ্ধদেব বসু বেশি আলোচনা করেছেন।


বিভিন্ন সংখ্যা থেকে বাংলাদেশের কবিদের কিছু কবিতাংশ তুলে ধরি-

১. কবিতা পত্রিকার ২০তম সংখ্যা (বৈশাখী, ক্রমিক ৮৩) সৈয়দ শামসুল হকের দুটি কবিতা- ‘দুইজন’ ও ‘স্টাডি’ ছাপা হয়। ‘চুপ করে থাকে সে আড়ালে/হাজার মনের ভিড়ে কখন যে ফোটে/রাত্রির ফুলগুলো লাজুক, অবুঝ/এক মন উন্মন করে/রাত আসে পাশাপাশি/সোনালি নদীরা বয় দুজন বিজনে/একজন যন্ত্রণায় কাঁপে/একজন থাকে সে আড়ালে- (দুইজন)’। এ সংখ্যায় শামসুর রাহমানেরও দুটি কবিতা আছে; ‘নির্জন দুর্গের গাথা’ ও ‘বিরস গান’। ‘দিনের সারথি বয়া গুটিয়ে নিলে,/যখন রাত্রি কৃষ্ণ কবরী নেড়ে/আনে একরাশ রারা-ফুল থরথর,/দু’হাতে সরিয়ে শ্যাওলার গাঢ় জাল/চমকে তাকাই আমিও মজ্জামান।’ (নির্জন দুর্গের গাথা)


২. কবিতা’র ১৮তম বর্ষের (আষাঢ়-আশ্বিন) ৫০ পৃষ্ঠায় আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘জলরং’ কবিতার অংশবিশেষ- ‘সহসা অবাক লাগে ছিপছিপে নদী আর উবু জনপদ/কাঁপে কার থরথর সজোর ঘোড়ার খুরে, বনঝোপগুলি/কানখাড়া স্নেহাতুর হরিণশিশুর মতো, খড়ের বাসায়/কোকিলের বলাবলি, কেন এত গান জমে গলায় গলায়/হৃদয়ের ঢেউ ছুঁয়ে? ...নামুক এবার/লাল টুকটুক/আগুনের রঙ তোমাদের মুখে...’।


৩. পত্রিকার ২১ বর্ষ (আশ্বিন সংখ্যা, ৫০ পৃষ্ঠায়) সংখ্যায় শহীদ কাদরীর ‘নির্বাণ’ কবিতা থেকে চুম্বক অংশ তুলে দিচ্ছি- ‘রাস্তার ধারে সে ঝুলছে,-বাচাল বসন্তের অধিরাজ।/পিচ্ছিল পোকাগুলো তার হা-করা চোখের/চুঁইয়ে-পড়া রসে ঘুরছে, কী মসৃণ!/...এবং চোখের মণিতে তার পড়েছে ধরা/নির্বিকার চিরন্তন,-থেমে আছে অপরূপ/বিশাল, বাসন্তী আকাশ সন্ধ্যার,-/গভীর ধ্যানীর মতো মোহব, তন্ময়।’


৪. আমরা জানি, ভারতে অনেক আগে থেকেই রেলযোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই উন্নত। পশ্চিমবঙ্গের রানাঘাট একটি জনবহুল রেল জংশন। এ স্টেশনের কর্মচাঞ্চল্য নিয়ে আবুল হোসেনের ‘রানাঘাট’ কবিতা। এ কবিতা থেকে- ‘অবিরাম হুইসিল বাজে। ট্রেন আর ট্রেন;/কোলাহলময় রাত্রি দিন। ট্রেন আসে, থামে, ছাড়ে। ছুটে যায়।/উড়ন্ত সময়। মেল, গুডস, শাটল, স্পেশাল, প্যাসেঞ্জার।/অবিশ্রান্ত গতি বাঁধা ইস্পাতের আগুনে চাকায়’- (৮ম সংখ্যা)


বোদলেয়ার, রিলকে, হেল্ডরনি, ব্লেক, পাস্তারনাক প্রমুখের কবিতার অনুবাদ করেছেন বুদ্ধদেব বসু। পৃথিবীর সমস্ত কবি ও লেখকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইতেন তিনি। ঘুরে বেরিয়েছেন বিভিন্ন দেশে। পড়িয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই সুবাদে বিভিন্ন লেখক ও কবির সঙ্গে তার পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। ১৯৫৪ সালে বিবিসি থেকে মার্কিন লেখক হেনরি মিলারকে প্রশ্ন করা হয়, এ বছর (১৯৫৪) আপনার জীবনের সবচেয়ে বিশেষ ঘটনা কী ছিল? তিনি উত্তর দেন, বাঙালি কবি বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে পরিচয়- (আমার বাবা বুদ্ধদেব বসু)। কবি বুদ্ধদেব বোদলেয়ারসহ বেশ কিছু কবিতা বাংলায়ন করেছেন। অনুবাদেও মুন্সিয়ানার ছাপ পাওয়া যাবে। একটি উদাহরণ দেই- ‘বলো আমাকে রহস্যময় মানুষ, কাকে তুমি/সবচেয়ে ভালবাসো?/তোমার পিতা, মাতা, ভ্রাতা অথবা ভগ্নীকে?/পিতা, মাতা, ভ্রাতা অথবা ভগ্নী- কিছুই নেই আমার।।/আমি ভালবাসি মেঘ... চলিষ্ণু মেঘ.../উঁচুতে ঐ উঁচুতে/আমি ভালবাসি আশ্চর্য মেঘদল।’- (অচেনা মানুষ, মূল: শার্ল বোদলেয়ার; অনুবাদ: বুদ্ধদেব বসু)। এমন অসংখ্য অনূদিত কবিতা আছে প্রায় সংখ্যায়। বুদ্ধদেব বসুর পাশাপাশি অনুবাদ করেছেন সমর সেন, অমিয় চক্রবর্তী প্রমুখ।


রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিচিত্রমুখী স্রষ্টার নাম বুদ্ধদেব বসু। তার মূল পরিচিতি কবি হিসেবেই। কবিতার পাশাপাশি ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, ভ্রমণকাহিনি, শিশুসাহিত্য, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা লিখেছেন। এসবে তিনি সফল ছিলেন। সমালোচনা সাহিত্যকে তিনি নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। শুধু কবিতা নিয়েই অনেক গবেষণা করেছেন। বাংলা কবি ও কবিতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন আধুনিক কবিকূলের শেষ্ঠতর প্রতিনিধি। সমালোচক সুকুমার সেন বলেন, ‘তাঁর (বুদ্ধদেব বসু) লক্ষ্য ছিল আধুনিক কবিতার স্বত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং আধুনিক কবিতা লেখকদের পক্ষ সমর্থন করা।’


লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

  • সর্বশেষ - সাহিত্য