ময়মনসিংহ, , ৩০ বৈশাখ ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

রোজা কার উপর ফরজ কার উপর নয়?

রোজা কার উপর ফরজ কার উপর নয়?

রোজা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। মুসলমানদের জন্য হিজরী বছরের নবম মাস, রমজান মাস, যে মাসে পবিত্র কুরআন নাযিল হয়েছিল, সে মাসে রোজা রাখা ফরজ। রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে ফরজ রোজা নেই।

রোজা ফরজ হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে। প্রথম শর্ত হলো- রোজাদারকে মুসলিম হতে হবে। অর্থাৎ কাফির, নাস্তিক কিংবা মুসলিম ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর রোজা ফরজ নয়।

ফরজ রোজার শর্তসমূহের আরেকটি শর্ত হচ্ছে- আকেল বা বোধ-বুদ্ধি সম্পন্ন হওয়া। অর্থাৎ যদি কোনো ব্যক্তি পাগল হন, তাহলে তার উপর রোজা ফরজ হবে না। কোনো একজন ব্যক্তি যদি ঈমানদার চিকিৎসকের সিদ্ধান্তে পাগল হিসেবে বিবেচিত হন, তাহলে তার ওপর রোজা নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি সুস্থ হয়ে বুদ্ধিসম্পন্ন ও বোধসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত না হবেন।

রোজা রাখা ফরজ হওয়ার আরেকটি শর্ত হচ্ছে বালেগ হওয়া বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। যদিও দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বয়স বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। তবুও ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে একজন (নারী কিংবা পুরুষ) বালক-বালিকা প্রাপ্তবয়স্ক বা প্রাপ্তবয়স্কা হওয়ার ব্যাপারে কিছু লক্ষণ রয়েছে। পুরুষের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার জন্য দাড়ি, গোঁফ গজানো, অথবা স্বপ্নদোষ হওয়ার মতো অবস্থা যদি হয়, কিংবা গলার স্বর পরিবর্তন হয়ে যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে যে সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে। নারীর প্রাপ্তবয়স্কা হওয়ার বড় লক্ষণ হলো তার পিরিয়ড। তবে হরমোনজনিত কারণে, কিংবা রোগের কারণে পিরিয়ড দেরি হলে অন্যান্য লক্ষণগুলো ধরে প্রাপ্তবয়স্কা হওয়ার বিষয়টি নির্ধারণ করতে হবে।

এছাড়া দুটি অবস্থা রয়েছে, সেই ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে রমজান মাসেও রোজা না রাখার সুযোগ রয়েছে। তবে রমজানের পরে বাকি ১১ মাসের মধ্যে যে কোনো সময়, অথবা পরবর্তীতে কোনো এক সময় তাঁকে এই রোজা কাযা আদায় করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি যদি রোজা রাখলে তার রোগ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা হয়, অথবা অন্য কোনো নতুন রোগ দেখা দেয়ার আশঙ্কা হয়, অথবা রোগমুক্তি বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা হয়, তাহলে রোজা ছেড়ে দেয়ার অনুমতি রয়েছে। তবে তাকে সুস্থ হওয়ার পর ছেড়ে দেয়া রোজা কাযা করে নিতে হবে। অসুস্থ অবস্থায় রোজা ছাড়তে হলে অবশ্যই কোনো দ্বীনদার, ঈমানদার, পরহেজগার চিকিৎসকের পরামর্শ বা প্রেসক্রিপশন থাকতে হবে। নিজের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ভিত্তিতে যদি হয় তাহলেও হবে। তবে যদি কেউ কাল্পনিক খেয়ালের বশীভূত হয়ে এমনি আশঙ্কা বোধ করে, তবে রোজা ছাড়া ঠিক হবে না। এ ক্ষেত্রে কাযা এবং কাফফারা উভয়টিই তার উপর ওয়াজিব হবে। তবে আমরা জানি, আমাদের নিয়ত কি? সেটা আল্লাহর কাছে গোপন নেই।

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে- সফর বা ভ্রমণ। কেউ যদি হজ্ব, উমরা অথবা অন্য কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য বা জরুরি বিষয়ে এক দেশ থেকে অপর দেশে, অথবা এমন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করে, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে সফর হিসেবে পরিগণিত হয়, সেই অবস্থায় সেই সময়ের বা সেই দিনের অথবা দিনগুলোর রোজা সে না রেখে পরবর্তীতে কাযা করতে পারবে। আর যদি কেউ রোজা না রাখার বাহানা ধরে দেশ থেকে দেশান্তরে সফর করে বেড়ায়, তাহলে তার রোজা ছেড়ে দেয়া কখনই উচিত হবে না। কারণ বিষয়টি যদিও আপাত দৃষ্টিতে সকলের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে যে সে সফর করছে, কিন্তু তার সফরটি কেন করছে, তার সেই অন্তরের গোপন কথাটি মহান আল্লাহ ভালো করেই জানেন। কারণ রোজা হচ্ছে রোজাদার এবং তার স্রষ্টার মধ্যেকার বিশেষ অবস্থা।

তেমনিভাবে রোগ মুক্তির পর যে দুর্বলতা থাকে, তখন রোজা রাখলে যদি পুনরায় রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা হয়, তাহলে তখন রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে, পরে তা কাযা আদায় করে নিতে পারবে।

একইভাবে গর্ভবতী মা বা দুগ্ধদায়িনী স্ত্রীলোক রোজা রাখলে, যদি নিজের জীবনের ব্যাপারে বা সন্তানের জীবনের ব্যাপারে আশঙ্কা বোধ করে, বা রোজা রাখলে দুগ্ধ শুকিয়ে যাবে, আর সন্তানের সমূহ কষ্ট হবে, এরূপ বিষয়ে নিশ্চিত হলে তখনও তার জন্য রোজা ছেড়ে দেয়া বৈধ। পরে তা কাযা আদায় করে নিতে হবে। স্ত্রীদের মাসিক পিরিয়ডের সময় রোজা ছেড়ে দিতে হবে। একইভাবে কোনো স্ত্রীলোকের সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর রক্তক্ষরণের সময়, যাকে শরীয়তের ভাষায় ‘নিফাস’ বলা হয়, এই সময়ও রোজা ছেড়ে দিতে হবে; এবং এ সব ক্ষেত্রে পরে তা কাযা আদায় করে নিতে হবে।

ছেলে বা মেয়ে ১০ বছর বয়স হয়ে গেলে, তাদেরকে বুঝিয়ে, বা কিছুটা চাপ দিয়ে হলেও রোজা রাখানো অভিভাবকদের কর্তব্য। এর আগেও যদি সম্ভব হয়, তা হলেও ছেলে-মেয়েদের রোজার অভ্যাস করানো উচিত। তবে এক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত রোজা না রাখলে সেই ছেলে বা মেয়ে আল্লাহর কাছে গুনাহগার হবে না। আল্লাহ আমাদের জেনে বুঝে আমল করার তাওফীক দিন। আমীন!

  • সর্বশেষ - অতিথি কলাম