ময়মনসিংহ, , ২৮ বৈশাখ ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

করোনায় বেঁচে থাকাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি

  ফিচার

  প্রকাশ : 

করোনায় বেঁচে থাকাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি

সুরাইয়া পারভীন

লকডাউন চলছে, কঠোর লকডাউন। দ্বিতীয় ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। কোভিড নামধারী এক ভাইরাস মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে হামলে পড়ছে। মানুষ অসহায়, ভীষণ রকমের অসহায়। মেডিকেল সায়েন্স কূল-কিনারা করতে পারছে না। কোভিড ভাইরাস তার ধরন-প্রকৃতি বদলে চলেছে প্রতিনিয়ত। ডাক্তার, নার্সসহ মেডিকেল সেক্টরের সবাই জান বাজি রেখে কাজ করে চলেছেন। মিছিল চলছে, মৃত্যুর মিছিল। আজ যে শব কাঁধে নিচ্ছে, কাল অন্যের কাঁধে তার নিথর দেহ। অনিশ্চিত জীবন শঙ্কায় মানুষের দিন পেরোয়, রাত ভোর হয়। আগামী দিনের সূর্য, সে যেন জীবনের বিশাল প্রাপ্তি।

একবিংশ শতাব্দিতে এসে মানুষ যখন পুরো পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় পুরে দেখার আনন্দে বিভোর। পৃথিবীর কোন প্রান্তে কী ঘটছে, আগ্রহী যে কেউ, যেকোন প্রান্তে বসে সে খবর জানতে পারবে। ‘মেরু অঞ্চলের বরফ এ বছর কী পরিমাণ গলেছে।’ এ খবর জানতে শহুরে ছেলে হওয়ার দরকার নেই। ভদ্র সমাজে মিশে, শুদ্ধ বাংলায় তাকে কথা বলা শিখতে হবে না। তাকে শুধু তার আগ্রহের কেন্দ্রে থাকলেই চলবে। বিজ্ঞানের জয়-জয়কার সর্বত্র।

এমনই সময়ে করোনাভাইরাসের আগমন। আমাদের দেশের বর্ষার কদম ফুলের মতো দেখতে করোনাভাইরাসের গড়ন। এসির মতো শীতল জায়গায় অবস্থান নেয়। শরীরের অর্গান বরফ-শীতল জমাট করে ফেলতে চায়। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ভেন্টিলেশন দিয়ে আর কতটুকু টিকে থাকতে পারে। গলা থেকে ফুসফুস, কিডনি, হার্ট, মস্তিস্ক- ভাইরাসের বিচরণ ক্ষেত্র সর্বত্র। শরীরের ভেতরে যতদিন অবস্থান নেবে, তত বেশি যেন শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ভাইরাসটির যেমন এসির মতো শীতলতা পছন্দ, তেমনই অপছন্দ গরম পানি ও চা। তাই তো আক্রান্ত হলে নাকে ভাঁপ নিতে হয়। কোনভাবেই ঠান্ডা কিছু পান করা যাবে না। কারণ করোনাভাইরাস শরীরে প্রবেশের পরেও সুপ্ত অবস্থায় চার-পাঁচ দিন থাকে। তাই সব সময় গরম পানির পরিচর্যায় থাকুন। সাথে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। সন্দেহ হলে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখবেন। আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন আগে খুব ভারি শোনালেও এখন সবারই পরিচিত শব্দ।

‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে এসেছিল ‘ওলাওঠা’ বুড়ি। কী যে ভয় দেখিয়েছে মানুষকে। পৃথিবীর সস্তাতম ওষুধ মনে হয় আমাদের দেশের এই ওরস্যালাইন। অথচ কী কঠিন রোগের বিরুদ্ধে এর অবস্থান। গ্রামকে গ্রাম বিরাণ করে ফেলা এ অসুখ; লবণ, পানি, চিনিতে ধ্বংস হয়ে যায়। কী জানি, কে বলতে পারে? হয়তো বা করোনার সুরক্ষা এরকম সামান্য কিছুতেই আছে।

ভ্যাকসিন চলছে, যদিও বা সীমিত আকারে। তবুও আশা জাগানিয়া। তবে ভ্যাকসিন নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকবেন না। মাস্ক ঠিকভাবেই পরতে হবে। দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার ব্যবহার সব একই নিয়মে চলবে।

করোনাকালে বেসরকারি চাকরিজীবীদের জীবনে নাভিশ্বাস উঠছে। করোনার চেয়ে ভয়াবহ হয়ে উঠছে সংসারের ব্যয়ভার। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বেতন কমিয়ে দিচ্ছে। ছাঁটাইয়ের ব্যবস্থা তো আছেই। দিনমজুর, ছোট ব্যবসায়ীদের লকডাউনের আওতায় কিভাবে আনবেন? তাদের কাছে করোনার চেয়ে ক্ষুধা অনেক বেশি শক্তিশালী। জরিমানা করেও ঠেকানো যায় না। এদের দরজায় চাল, ডালসহ দরকারি জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারলে যদি সুফল মেলে।

বলা হয়, বৈরী সময়ের দরকার আছে। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের চিনে নেওয়া যায়। মানুষ হয়ে জন্মানোর মূল্য পরিশোধ করতে কিছু মানুষ সদা তৎপর থাকে। এই করোনায় কিছু মানুষ পথে বেরিয়েছেন। নিজেদের মনুষ্যত্বের দাবি মেটাতে। পরিচিত, অপরিচিত- লাশ দাফনের দায়িত্ব নিয়েছেন। ভিন্ন ধর্মীর লাশ সৎকার করেছেন। মানুষের দরজায় ফেরিওয়ালার মতো খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন। শ্রদ্ধা তাদের জন্য।

লেখক: কলামিস্ট।

  • সর্বশেষ - ফিচার