, ৭ আষাঢ় ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

ময়মনসিংহে লকডাউনে পথচারী ও দুঃস্থদের জন্য জেলা পুলিশের ৫ টাকার ইফতার বক্স

  শাহ মোহাম্মদ রনি

  প্রকাশ : 

ময়মনসিংহে লকডাউনে পথচারী ও দুঃস্থদের জন্য জেলা পুলিশের ৫ টাকার ইফতার বক্স

করোনা পরিস্থিতি ও লকডাউনে ময়মনসিংহ নগরীতে পথচারী ও কষ্টে থাকা দুঃস্থ মানুষের জন্য জেলা পুলিশের ৫ টাকার ইফতার বেশ সাড়া জাগিয়েছে। প্রতিদিন ইফতারের আগে নগরীর কোনো না কোনো মোড়ে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ইফতার বিতরণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। চতুর্থ রোজা থেকে চালু হওয়া এ উদ্যোগে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার বক্স ইফতার বিতরণ করা হয়। ঈদের আগের দিন পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ পথচারী এবং দুঃস্থদের মধ্যে নামমাত্র ৫ টাকার বিনিময়ে ইফতার বিতরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। লকডাউনে পথচারী ও দুঃস্থদের সহযোগিতা করার প্রয়াসে পুলিশ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ৫ টাকার ইফতার বক্সে থাকছে ছোলা, পিয়াঁজু, বেগুনি, শসা, জিলাপী, মুড়ি, কলা, আঙ্গুর ও খেজুর। যা একজন মানুষের জন্য পরিপূর্ণ। প্রতীকী মূল্যে ভরপেট ইফতার বক্স বিতরণ কার্যক্রম মনে রাখার মতো। এদিকে সর্বস্তরের নাগরিক, সামাজিক ও সুশীল সমাজের নেতারা দৈনিক জাগ্রত বাংলা’কে জানান, করোনা পরিস্থিতি ও লকডাউনে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের বিশেষ অবদান মনে রাখবেন সর্বস্তরের ময়মনসিংহবাসী। আক্রান্তের ঝুঁকি নিয়ে সার্বক্ষণিক কাজ করছেন মানবিক পুলিশ সুপার মোহাঃ আহমার উজ্জামান। গত বছর করোনার প্রথম ঢেউ মোকাবিলার সময় তিনি অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্যপণ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ করে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এর পরই ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে পুলিশের প্রতিটি ইউনিটে। মানবিকতার টানে মানুষের সেবায় এগিয়ে আসা অন্যান্য জেলা পুলিশের মধ্যে ময়মনসিংহ অন্যতম। নেতারা বলেন, ‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার পুলিশ হবে জনতার’ এবং ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’ এই ২ স্লোগানকে বাস্তব রূপ দিয়েছে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ।


গত ১৭ এপ্রিল শনিবার বিকালে নগরীর টাউন হল মোড়ে ৫ টাকায় সুস্বাদু ইফতার বক্স বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন মানবিক পুলিশ সুপার মোহাঃ আহমার উজ্জামান। মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত টাউন হল মোড়, পাটগুদাম ব্রিজ মোড়, রেলওয়ে কৃঞ্চচূড়া চত্বর এবং সিকে ঘোষ রোড প্রেসক্লাবের সামনে সুস্বাদু ইফতার বক্স বিতরণ করা হয়। মাত্র ৫ টাকায় ইফতার পেয়ে বেজায় খুশি পথচারী এবং দুঃস্থ মানুষ। অনুভূতি জানার জন্য মঙ্গলবার সিকে ঘোষ রোড প্রেসক্লাবের সামনে থেকে ইফতার নেওয়া অনেকের সাথে কথা হয়। নগরীর শিকারীকান্দায় বাড়ি পথচারী আব্দুল মালেক, খাগডহরে বাড়ি পথচারী শফিকুল ইসলাম, মুক্তাগাছার খেরুয়াজানী বাড়ি রিকশা চালক মেরাজ উদ্দিন, ময়মনসিংহ সদরের বেগুন বাড়ির রিকশা চালক আব্দুল মোতালেবসহ অনেকেই অভিন্ন মন্তব্যে জানান, নামমাত্র ৫ টাকায় পুলিশের ইফতারের উদ্যোগ মনে রাখার মতো। এতে পুলিশের প্রতি আমাদের ধারণা পাল্টে গেছে। এদিকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও ভয়ালথাবায় দেশ যখন টালমাটাল তখনই দ্বিতীয় বারের মতো মানবিকতার টানে মানুষের জন্য এগিয়ে আসে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ। পথচারী ও দুঃস্থদের হাতে ইফতার তুলে দেওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন মানবিক পুলিশ সুপার মোহাঃ আহমার উজ্জামান পিপিএম (সেবা)। অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত ও জনসচেতনা বাড়ানোর জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে ময়মনসিংহ নগরী ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলায়। এর আগে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা নাগরিকদের মাস্ক এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী উপহার দেন।


জানা যায়, গত বছর করোনার প্রথম ঢেউ মোকাবিলার সময় ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নগরী ও বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ করা হয়। একই সময় প্রায় ২ হাজার বক্স রান্না করা সুস্বাদু খাবার বিতরণ করা হয় নগরীর ভাসমান, অসহায় ও রিকশা চালকদের মধ্যে। পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় ময়মনসিংহ নগরীতে ডিবির অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ শাহ্ কামাল আকন্দ এবং বিভিন্ন উপজেলায় সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জরা (ওসি) খাদ্যপণ্য বিতরণ করেন। সূত্র মতে, এসপি থেকে শুরু করে কনস্টেবলদের নিজস্ব টাকায় অসহায়দের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ করা হয়। ওই সময় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী ফুলপুর-তারাকান্দা আসনের এমপি শরীফ আহমেদ অসহায়দের মধ্যে বিতরণের জন্য জেলা পুলিশের কাছে ৭০০ ব্যাগ খাদ্যপণ্য পাঠান। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থা, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষে রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গ স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী প্রদান করেন। পুলিশ সুপার মোহাঃ আহমার উজ্জামান পিপিএম (সেবা) দৈনিক জাগ্রত বাংলা’কে বলেন, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার বিষয়ে জেলা পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। জনসচেতনার পাশাপাশি আপদকালীন সময় পর্যন্ত পুলিশের মানবিক কার্যক্রম চালু থাকবে। তিনি বলেন, জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য ময়মনসিংহ নগরীসহ বিভিন্ন থানা এলাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণের প্রচারপত্র বিতরণ এবং মাইকিং করা হচ্ছে। এদিকে জনসমাগম কমানো এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে পুলিশ সুপারের নির্দেশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে ডিবি, কোতোয়ালিসহ বিভিন্ন থানা এবং ফাঁড়ি পুলিশ।


সূত্র জানায়, করোনা পরিস্থিতিতে সরকার গত বছর প্রথম দফায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পরই ময়মনসিংহ নগরীতে খেটে খাওয়া ও নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি সমস্যায় পড়েন। সঞ্চিত অর্থ শেষ হওয়ার পর অসহায় হয়ে পড়েন নগরীর বিপুল সংখ্যক পরিবার। হাহাকার সৃষ্টি হওয়ার আগেই মানবিক পুলিশ সুপার মোহাঃ আহমার উজ্জামান অসহায়দের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। তালিকা তৈরী করা হয় খেটে খাওয়া ও নিম্ন আয়ের মানুষের। পরে গত বছরের ৩১ মার্চ থেকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে খাদ্য সঙ্কটে থাকা অসহায়দের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ শুরু করে জেলা পুলিশ। খাদ্যপণ্য পাওয়া অধিকাংশরাই ছিলেন নিম্ন আয়, হতদরিদ্র, কর্মহীন, অক্ষম, ভাসমান এবং অসহায় মানুষ। নগরীর একটি প্রতিষ্ঠানের অর্ধশত এতিমদের আশ্রয়স্থল খুঁজে বের করে তাদেরকে খাদ্যপণ্য দিয়ে ব্যাপক আলোচিত হন এই পুলিশ সুপার। তিনি নিজ হাতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার উল্লেখযোগ্য পরিমাণের অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ করেন। ওই সময় জেলা পুলিশের ফেসবুক পেজ, পুলিশ সুপার এবং ওসি ডিবির ফেসবুক মেসেঞ্জারে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে না খেয়ে থাকার কথা জানান অনেকেই। পরে এসব অসহায় পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় খাদ্যপণ্য। এদিকে পুলিশ সুপার মোহাঃ আহমার উজ্জামানের নির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) জয়িতা শিল্পী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) গোলাম ফজলে রাব্বি, জেলা গোয়েন্দা শাখার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ শাহ্ কামাল আকন্দ, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সৈয়দ মাহবুবুর রহমান ও কোতোয়ালি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ ফিরোজ তালুকদার প্রমুখ সরাসরি জেলা পুলিশের মানবিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রয়েছেন।


সম্পাদনায়: নাসিমুল গনি ইশরাক

  • সর্বশেষ - আলোচিত খবর