, ৫ আষাঢ় ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

মহাল থেকে নেয়া বালুতে হচ্ছে সরকারি রাস্তা!

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

মহাল থেকে নেয়া বালুতে হচ্ছে সরকারি রাস্তা!

শেরপুরের একটি সরকারি রাস্তা নির্মাণের কাজে জোরপূর্বক নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ঝিনাইগাতী উপজেলার ঘাগড়া প্রধানপাড়া সুইচগেট থেকে হদিপাড়া রাস্তার কাজে এই অনিয়ম বন্ধে আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী। অভিযোগ রয়েছে, হাইকোর্টের স্থিতাবস্থার তোয়াক্কা না করে বালু মহাল থেকে অবৈধভাবে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ওই রাস্তায় বালু ব্যবহার করছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় প্রভাবশালী মহল।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) তথ্যমতে, একবছর মেয়াদে ঝিনাইগাতী উপজেলার ঘাগড়া প্রধানপাড়া সুইচগেট থেকে হদিপাড়া রাস্তায় নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পায় রাজধানী ঢাকার ওয়েস্টার কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড শিপিং কোম্পানি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ এসএম এ ওয়ারেজ নাইম কাজটি তদারকি করছেন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা। কাগজে-কলমে সব তথ্য ওই প্রতিষ্ঠানের নামে থাকলেও কাজটি স্থানীয়ভাবে উপজেলা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে এই রাস্তার কাজে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ করেছেন পাগলারমোখ বালু মহালের ইজারাদার আতিউল্ল্যাহ আতিক নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘এই রাস্তার কাজটি আমার লিজ নেয়া পাগলারমোখ বালু মহালের পাশে। এই মহালে লিজ নেয়া প্রতিষ্ঠান বাদে বালু উত্তোলনে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এই রাস্তার কাজ শুরুর পর থেকেই সাবেক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন পেশিশক্তি প্রদর্শন করে বালু উত্তোলন করে আসছেন। রাস্তার জন্য বালু কিনতে সরকারি বরাদ্দ থাকলেও জোরপূর্বক বালু নিয়ে টাকা লোপাট করা হচ্ছে। আমি এর বিচার চাই।’

jagonews24

তিনি আরও বলেন, ‘উপজেলা চেয়ারম্যান নাইমের যোগসাজশে নাসির চেয়ারম্যান এখান থেকে মেশিন দিয়ে বালু তুলছেন। এটা নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নাইমকে নিষেধ করতে গেলে উল্টো আমাকে ভয়ভীতি আর হুমকি দিয়েছেন। আমি খুব শঙ্কায় আছি। একদিকে উপজেলা চেয়ারম্যান নাইম, আরেকদিকে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নাসিরের লোকজন আমাকে ভয়ভীতি দেখিয়েই যাচ্ছে। আমি থানা আর ইউএনও অফিসে এটা নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছি।’

উচ্চ আদালতের রিট পিটিশন ৪৬৯৯/২০১৮ এর তথ্যমতে, পাগলারমোখ বালু মহালের ইজারাদার আতিক এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আতিউল্ল্যাহ আতিক ২০১৭ সাল থেকে এই বালু মহাল ভোগ করে আসছেন। তার দায়ের করা রিট অনুযায়ী, মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ২০১৮ সালে ওই বালু মহালে ইজারার দখল ও অবস্থানের ওপর স্থিতাবস্থা ঘোষণা দেন আদালত।

বৃহস্পতিবার (২৯ এপ্রিল) সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ওই রাস্তার নির্মাণ কাজে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর বিট বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। নদীতে দুটি স্যালোমেশিন ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করে সরবরাহ করা হচ্ছে সরকারি রাস্তায়।

jagonews24

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘এই রাস্তার কাজ করতাছেন উপজেলা চেয়ারম্যান নাইম। আর রাস্তার বালু দিতাছেন নাসির চেয়ারম্যান। আমরা এটুকুই জানি। রাস্তার কাম ভালা হোক, হেইডাই আমরা চাই। বিচার আর সমালোচনা কইরা কাজ বন্ধ হইলে আমগোর বিপদ হইব।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী লাল মিয়া বলেন, ‘এই রাস্তার কাজে বালুর দাম ধরা আছে। নাসির চেয়ারম্যান ক্ষমতা দেখিয়ে নদী থেকে বালু তুলছেন।এই বালুর ইজারা আতিক সাবের নামে। তারা জোর করে এই বালু তুলে রাস্তার কামে দিতাছে। যা পুরোপুরি অন্যায়।’

হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বালু উত্তোলন প্রসঙ্গে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন বলেন, ‘রাস্তার কাজে বালু সরবরাহ করছেন অন্যজন। আমি এর সঙ্গে জড়িত না। তিন টাকা প্রতি সেফটি দরে ৭৫ হাজার সেফটি বালু কিনে এই রাস্তায় ব্যবহারের কথা শুনছিলাম। আমি বালু ব্যবসা করিই না। তাই বালু আমি দিতে পারছি না। এইডা উপজেলা চেয়ারম্যান নাঈমের কাজ, উনিই ভালো বলতে পারবেন।’

ঝিনাইগাতী এলজিইডির প্রকৌশলী মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘রাস্তার কাজটা কাগজে-কলমে ওয়েস্টার কোম্পানির। আমরাও সব বিল ও অফিসিয়াল যোগাযোগ তাদের সঙ্গেই করি। তবে কাজটা লোকালি উপজেলা চেয়ারম্যান নাঈম সাহেব তদারকি করছেন। উনি কার কাছ থেকে কীভাবে বালু নিচ্ছেন, এসব তো আমরা দেখি না। তবে অবৈধভাবে বালু তুললে সেটা আসলেই ঠিক কাজ হবে না। কারণ এই বালুর জন্য তো সরকারের টাকা বরাদ্দ দেয়া আছে।’

ঝিনাইগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফায়েজুর রহমান বলেন, ‘উনি (আতিক) আমার কাছে একটি অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন। যেহেতু বালু মহালের ইজারার বিষয়টি ডিসি মহোদয় ও ইউএনও মহোদয় দেখেন, আমি তাদের কাছে অভিযোগ করতে বলেছি এবং বিষয়টি দেখার জন্য একজন অফিসারকে দায়িত্ব দিয়েছি।’

jagonews24

জানতে চাইলে বালু মহালটি নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি মামলা চলমান আছে বলে জানান ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুবেল মাহমুদ।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ওই মামলা নিয়ে আমরা আইনগতভাবে কাজ করছি, সেখানে ব্যক্তিগতভাবে আমাদের যাওয়ার সুযোগ নেই। এই স্থিতাবস্থা চলাকালে অন্য কেউ বালু তুললে, সেটা অবশ্যই অবৈধ হবে আর এটা নিয়ে আমাদের করারও কিছু নেই। তবে আদালতের রায়ের আগে কেউ বালু তুললে, তিনি (আতিক) আদালত অবমাননার মামলা করতে পারবেন।’

ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম এ ওয়ারেজ নাইম ফোনে বলেন, ‘কাজটা আমার উপজেলার, এজন্য আমি কাজ দেখভাল করছি। বালু মহালের ইজারা যার নামে, উনিই এখানে জবরদখল করে খাচ্ছেন। আর ব্রিজ নির্মাণের জন্য পানির গতিপথ করতেই একটু বালু তোলা হচ্ছে, এটা কোনো বেআইনি না।’

এ বিষয়ে তিনি পরে সাক্ষাতে কথা বলতে চেয়ে ফোন রেখে দেন।

  • সর্বশেষ - মহানগর