, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

রেডিওর সাথে সখ্য

  লাইফস্টাইল ডেস্ক

  প্রকাশ : 

রেডিওর সাথে সখ্য

নাজনীন তৌহিদ

রেডিও প্রসঙ্গ এলে কিংবা রেডিওতে অনুষ্ঠান করি বললে অনেকে একটু ভ্রু কুঁচকে বলেন, আজকাল রেডিও শোনে নাকি কেউ! আমি বলি, আর কেউ শোনে কি-না জানি না, তবে আমি শুনি । কেননা রেডিও বা বেতারের সাথে সখ্যতা আমার বহুদিনের।

শুধু আমি নই। আমার মতো রেডিওভক্ত একসময় অনেকেই ছিলেন। একসময় এ মাধ্যমই ছিল আমাদের একমাত্র বিনোদনমাধ্যম। কালের স্রোতে হয়তো অনেক কিছুই হারায়। তবে কিছু ভালোলাগা, কিছু ভালোবাসা কখনো হারাবার নয়। আর না হোক, অনেক স্মৃতির ভিড় ঠেলে সে যেন কবিতা হয়ে কানে কানে এসে বলে, ‘আমি তো তোমার সেই অতীত। যাকে ফেলে এসেছো অনেক অনেক দূরে। তোমাকে ভালোবাসি বলেই ছাড়িনি তোমার পিছু, অনায়াসে বিলিয়েছি আমার সবটুকু, গড়েছি তোমার অতীত, বর্তমান। অতঃপর সাজিয়েছি তোমার ভবিষ্যৎ। বিনিময়ে চাইনি তো কোনো কিছু। তবু কেন কর অবহেলা এমন? চারিদিকে তোমার বন্ধু ভুরিভুরি এখন। আমি কি তোমার কেউ নয়? ছিলাম না-কি কোনো জন?’

সত্যি বলছি, সে ছিল আমার কেউ একজন। তাই অনেক কিছু ভুলে গেলেও এই তাকে ভুলতে পারি না। সে আমার প্রথম প্রেমের মতো আমাকে জড়িয়ে রাখে। তাকে ভুলতে পারি না বলেই আজও তাকে আঁকড়ে রাখি। আজ এই একবিংশতে এসে আগারগাঁও জাতীয় বেতার ভবনে গিয়ে দাঁড়ালে যেন হারানো সুর খুঁজে পাই।

আমাদের পরিবারটা ছিল সংস্কৃতিমনা পরিবার। একদিন মায়ের গান শুনেই বাবা মাকে সপে ছিলেন মন-প্রাণ। এই সত্তরের কোঠায় এসেও মায়ের কণ্ঠ ম্লান হয়নি এতটুক, যদিও এখন আর চর্চা নেই তার। মায়ের সুর চলে গেছে, তাই মা এখন দূরের আকাশ পানে চেয়ে তার হারানো সুর খোঁজেন! জানি তার সুর আর ফিরে আসবে না। তবু মিছে মায়ার বাঁধনে আমার চোখ পুড়ে যায়, বুকের মধ্যে কষ্ট হয়। এ হারানোর বেদনা কাউকে বোঝানো যাবে না। বড় হতে হতে এখন অনেক বড় হয়ে গেছি। তাই আর চোখে মন খারাপের বৃষ্টি নামে না! তারা এখন বুকের মাঝে মেঘ হয়ে জমা থাকে।

না, আমার মা বড়মাপের কোন শিল্পী ছিলেন না। তবে ঠোঁটের কোণে তার শিল্প ছিল। কোনো কোনো জ্যোৎস্না রাতে আমরা সব ভাই-বোন একসাথে হলে গ্রামের বাড়ির ছাদে বসে পুরোনো দিনের স্মৃতির ঝাপি খুলে বসি। বাবা শহরে চাকরি করতেন বলে শহর-গ্রাম নিয়েই ছিল আমাদের বসবাস। বুঝে ওঠার বয়স হবার আগেই রূপালি জগতের মোহে পড়েছিলাম। এখনো চোখে ভাসে রাজ্জাক-কবরীর অভিসার। আমার মা দেখতে সুলতানা কিংবা কবরীর মতো ছিলেন কি-না জানি না। তবে তার কাজল আঁকা টানা টানা চোখ, পেছনে বড় করে বাঁধা খোঁপা, কানের দুপাশের কয়েক গোছা চুল রিংয়ের মতো করে পেঁচিয়ে রাখা। কিংবা কপালের এক কোণের কয়েকটি চুলকে পেঁচিয়ে সাজিয়ে রাখা। তারপর কপালের মাঝখানে আইব্রু পেন্সিল দিয়ে একটি আলিফ টানা রমণীয় রমণীকে আমি মা বলে আবিষ্কার করি।

আমি মায়ের মতো হয়তো সুন্দরী ছিলাম না। বইয়ের পাঁজায় মুখ গোঁজা ঢিলাঢালা একটি ফ্রক পরা মেয়েকে দেখে যখন সবাই আড়চোখে তাকাতে লাগলো, আমার মা তখন এক রাতের মধ্যে হাতে সেলাই করা সালোয়ার-কামিজ পরিয়ে সেই মেয়েকে রূপবতী করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালালেন। কপালজুড়ে থাকা চ্যাপ্টা ভ্রুযুগলকে রেজার দিয়ে চেছে চিকন করে তাতে ভ্রু পেন্সিল দিয়ে টেনে টানটান করে দিলেন। সারাদিন টো টো করতে থাকা রোদে পোড়া মুখটাকে ফেস পাউডার ঘঁষে ফর্সা করে তুললেন। কেননা সেই সময়ে কন্যাকে অপ্সরী করে তোলার মতো আর কোনো জাদু মায়ের জানা ছিল না।

কিন্তু এত করলেও মায়ের মতো গানের কণ্ঠ তো আর হয় না! তাই স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় মেয়েকে সেরা কণ্ঠশিল্পী গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে মা তখন আমার পায়ে ঘুঙুর পরিয়ে নৃত্যের ছন্দ তোলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু না, তাও বেশি এগোলো না। আমাকে নিয়ে শত চেষ্টা মায়ের বিফল হলেও আমার ছোট ভাই-বোনেরা আমাকে ছাড়িয়ে গেল। আমার পরের ভাই গান গাইলে মনে হতো যেন এন্ড্রু কিশোর পুনর্জন্ম নিয়েছেন আমাদের ঘরে। আব্দুল জাব্বার, সুবীর নন্দী সবাই যেন ছিলেন আমাদেরই ঘরে।

তবে এসব শিল্পী তৈরির পেছনে আমার মায়ের পাশাপাশি আরেকজন ছিলেন। যিনি গ্রামের নির্জন ঘরে আমাদের একমাত্র সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলেন। আর তিনি থাকার জন্যই একদিন হঠাৎ আমার ভেতরও এক নতুন পরিবর্তন এলো। আমি একা একা ভাবতে লাগলাম, আমি রুনা লায়লা। কিছুদিন পর মনে হলো, না! আমি ববিতা। রূপালি জগতের রূপালি কন্যা হয়ে ওঠার জন্য আমার ভেতর তখন আর আমি থাকলাম না।

আমাদের মাঝে শিল্পীসত্তা জাগানিয়া বন্ধুটির নাম ছিল রেডিও। নিজের পাশাপাশি সেই সঙ্গী রেডিওখানাকেও যেন পারলে স্নো-পাউডার সাবান দিয়ে কেঁচে তুলি। হাতে সেলাই করা ফুল তোলা জামা পরিয়ে তাকেও সাজাই।

রেডিও আমাদের বাড়িতে কবে থেকে জানি না। তবে শহরে থাকাকালীন রেডিওর পাশাপাশি মাঝেমাঝে টিভি দেখার ভাগ্য হতো। না, সেই সত্তর দশকের দিকে বিশাল বেটিলিয়ান টানা হিমশিম খাওয়া বাবা আমাদের জন্য টেলিভিশন কিনে দিতে পারেননি কিংবা ক্যাসেট প্লেয়ার তখনো আমাদের আসেনি। তবে সিনেমা জগত আমাদের আবিষ্ট করে রাখত। সিনেমা হলে নতুন সিনেমা এলে যখন আমার রোমান্টিক বাবা মায়ের মনে রোমান্স জেগে উঠত; তখন সংসারে পরিবার-পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার দায়ে তারা লাইন বেঁধে একটা একটা করে গুনে-বেছে গোটা পাঁচ-ছয়েক আন্ডা-বাচ্চাকে সাথে নিয়ে সিনেমা হলে যেতে বাধ্য হতেন। কিন্তু সিনেমার ক্লাইমেক্সের সময়ই বিপত্তি ঘটত। আন্ডা-বাচ্চাদের একটা আরেকটার সাথে চিমটাচিমটি, খোঁচাখুঁচিতে মুখ হা করে ‘অ্যা অ্যা’ করে উঠলে যদিওবা বাবা-মা ওই সিনেমার পর্দায় চোখ নিবিষ্ট রেখেই হাত দিয়ে মুখ চাপা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। তবে ‘পেসাব করব’ বলে আরেক দফা মোচড়ামুচড়ি করে ট্যা ট্যা করে উঠে বাবার ইজ্জতের গোড়ার পানি শেষমেষ পাবলিকের পায়ের ওপর ফেলার জন্য আমাদের সিনেমার সাধ শেষ পর্যন্ত ঘোচাতে হলো। তবে ভাই-বোনদের মাঝে সবার বড় ছিলাম বলে সবাইকে না নিলেও মায়ের সাথে আমার যাবার পারমিশন মিলল। কেননা মাকে সিনেমা দেখার উস্কানিটা আমার মগজ থেকেই বের হতো বেশি। আর আমাকে কৈশোরে ইচড়েপাকা বানাবার ওস্তাদ ছিল আমাদের রেডিওখানা। সিনেমার বিজ্ঞাপন নিয়ে তিনি যেভাবে কথার খই ফোটাতেন যে, সিনেমা হলে না গেলে পেটের ভাত হজম হতো না। আত্মীয়ের বাসায় কিংবা বাড়িওলার বাসায় মাদুড় পেতে মেঝেতে বসে টেলিভিশনের সাদাকালো পর্দায় চোখ সিটিয়ে রেখে ছোট ভাই-বোনদের ছোট্ট মন পরিতৃপ্ত হলেও আমার অহমিকাটা ছিল একটু বেশি। কেননা আমি যে তখন নিজেকে রূপালি জগতের নায়িকা বানিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। তবে সে স্বপ্নের গুড়েবালি। একদিন দেখি তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাবা আমাদের ট্রেনের বগিতে তুলে দিলেন।

আমার বাবা নিজের এবং তার বাবার অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যার যৌথ বাহিনীর বিশাল বহর শহরে রাখতে না পারায় এবং নানা কারণে আমাদের ঠাঁই হলো একদিন গ্রামে। আর তাই তখন থেকে আমাদের একমাত্র বিনোদনসঙ্গী হয়ে উঠল এই রেডিও।

তখন গ্রামে কদাচিৎ বাড়িতে রেডিও ছিল। রেডিওর লম্বা-সরু অ্যান্টিনা টেনে ধরে দু’একটি বাড়িতে বিবিসির খবর শোনার প্রতীক্ষা চলত। দু’তিন গ্রাম পার করা আমার নানা বাড়িতে নানাভাই তাই করতেন। তিনি শিক্ষক ছিলেন বলে রেডিও খবর প্রচার পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকত। কেননা তাদের বাড়ি মুন্সি বাড়ি ছিল বলে রেডিও আর কোনো বিনোদনের পসরা বসাতে পারেনি। তবে আমাদের বাড়ির পাশের এক রসিক গাছি ভাইর দেখা মিলল অচিরেই। সে ছোট একটি রেডিও কিনে গাছের ডগায় ঝুলিয়ে রাখা শুরু করল। মানে রসিক ভাই তালগাছ কেটে রস বের করতেন। তাই উঁচু তালগাছের ডগায় রেডিও বসিয়ে রেখে ছায়াছবির গানের তালে তালে তালগাছের মুচির নরম মাংসে আলতো ভাবে ছুরির ফলা বসিয়ে রস নিংড়ে আনতেন। তবে তার লাজুক বদনের নতুন বউ রসের বড় ডোঙা জ্বালিয়ে গুড় বানাতে বানাতে তবু ফুরসৎ পেতেন না রেডিও ছুঁয়ে দেখার।

রাত দশটার ‘মধুমালা মদন কুমারের’ নাটক শুনতে আমাদের প্রতেবেশী চাচি ও ফুফুদের সাথে তখন আমার মায়ের ভীষণ খাতির। মায়ের ঘর লেপাই করা চুলা বানিয়ে দেওয়ার সাথীর তখন অভাব নেই। শীতের দিনের নিশুতি নাটক শোনা আর সেই সাথে খেজুর গাছ কিংবা তালগাছ থেকে তাজা রস পেড়ে এনে তা দিয়ে রাতে শিরনি রান্না করা যেন চাচা-ফুফুদের কাছে তখন কোনো ব্যাপারই নয়। রেডিওর অনুরোধের আসর গানের ডালি, বিজ্ঞাপন তরঙ্গ আর ছায়াছবির গান শুনতে শুনতে এভাবে একদিন কৈশোর পার করা নব যৌবনে পা দেওয়া আমি যেন পুরোদস্তুর গায়িকা ও নায়িকা ভাবতে শুরু করলাম নিজেকে। আর এভাবেই ‘আমি নিজের মনে নিজেই যেন গোপনে ধরা পড়েছি’। যে মা আমার পেছনে এত শ্রম দিয়েও গলায় সুর তুলতে পারলেন না। সেই মা আমার চলন-বলন দেখে তখন হা হয়ে থাকেন। এরপর চিঠিপত্র অনুষ্ঠান, সৈনিক ভাইদের জন্য অনুষ্ঠান ‘দুর্বার’, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘উত্তরণ’ এসব কিছুর একমাত্র নিবেদিত শ্রোতা আমি-আমরা।

তারপর হঠাৎ করেই যেন সময়ের স্রোতে জীবন পাল্টে যেতে লাগলো। আমার বেঁচে থাকার এই স্বপ্নজগত কেড়ে নিয়ে কেউ যেন নতুন প্রেমের হাতছানি দিতে লাগলো। রেডিওর জায়গায় ক্যাসেট প্লেয়ার এলো। এরপর সাদাকালো টেলিভিশন। তারপর ভিসিআর। এসব ছাড়িয়ে একসময় রঙিন টেলিভিশন এলো, ডিস অ্যান্টিনা এলো। সব এলো। কিন্তু তাই বলে আমার প্রথম ভালোবাসা, ভালো লাগা কেউ মুছে দিতে পারেনি। রেডিওর চ্যানেল ঘোরানো নিয়ে ভাই-বোনের সাথে খুনসুটি আর তাকে ঘিরে থাকার আনন্দ কেউ আমার থেকে কেড়ে নিতে পারেনি আজও। আর তার টান অনুভব করতাম বলেই একদিন সেই রেডিওর জগতেই নিজেকে বিলিয়ে দিলাম।

লেখালেখির অঙ্গনে ছিলাম বলে এ অঙ্গনের বাসিন্দাদের সাথে চেনা-জানা, ওঠা-বসা ছিল। তাই হঠাৎ একদিন একজন কবির আমন্ত্রণেই রেডিওতে প্রবেশ। যদিও আমার প্রথম অনুষ্ঠান নিয়ে সেই কবি কোন একটি বিষয় নিয়ে আমাকে আহত করেছিলেন এবং খুব কেঁদেছিলাম সেদিন। আমার ভেতরের আত্মবিশ্বাস আমাকে জীবনে হারতে শেখায়নি। জয় করতে শিখিয়েছে সব সময়। তাই সেই আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে সেনা কর্মকর্তা স্বামীর মন গলিয়ে সেনা ছাউনির গণ্ডি আর সমস্ত বাঁধাকে অতিক্রম করে আমি একদিন রেডিওতে প্রবেশ করতে সক্ষম হই। অনেক ভালোবাসা-স্নেহ পেয়েছি রেডিওর মানুষগুলো থেকে। সুন্দর কথামালা দিয়ে নিজেকে উপাস্থাপন করার দীক্ষাটা পাওয়া এই ভুবন থেকেই। আমার গুরু হয়ে যারা হাতেকলমে উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি আর কথাবন্ধু হতে সহায়তা করেছিলেন; তাদের অনেকেই আজ আর নেই। কিন্তু তাদের ভালোবাসা-স্নেহ অনুভব করি আজও পথ চলার প্রতিটি ক্ষণে। ১৯৯৯ সালে শুরু করে আজ ২০২১ সালে আমার স্বপ্নিল ভুবনে আমি বিরাজমান। সময়টা নেহায়েত কম নয়। তবে ভালো লাগা আর ভালোবাসা এর চেয়ে ঢের বেশি। ছেলেবেলা যে স্বপ্ন আমাকে ঘিরে রেখেছিল, তা যে কোনো দিন পরিণতি দিবে, তা ভাবিনি কখনো। সেই রঙিন দুনিয়ার মানুষগুলোর সাথে নিত্যদিন ওঠা-বসা হবে তাও ভাবিনি। একমুঠো স্বপ্ন হাতে নিয়ে এভাবেই রেডিওর সাথে বেড়ে ওঠা, প্রচারবিমুখ নেপথ্যে থাকা আমি নামের এই মানুষটার।

  • সর্বশেষ - লাইফ স্টাইল