, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

নির্যাতিত নারীদের গ্রামে পুরুষের প্রবেশ নিষেধ

  ভ্রমন ডেস্ক

  প্রকাশ : 

নির্যাতিত নারীদের গ্রামে পুরুষের প্রবেশ নিষেধ

‘দশে মিলে করি কাজ, হারি-জিতি নাহি লাজ’- পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকে বেরিয়ে কয়েকজন নারী মিলে অসম্ভবকে জয় করেছিলেন। নিজেরাই তৈরি করেছিলেন এক গ্রাম। পরিবার, আত্মীয় সবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে কোলের শিশুকে নিয়ে নারীরা ফাঁকা এক স্থানে বসতি স্থাপন করেন। যুগের যুগ ধরে তারা একতাবদ্ধ হয়ে গ্রাম তৈরি করে, নিজেদের অনুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন।

jagonews24

হয়তো ভাবছেন, কেন এ গ্রামে নারীরা পরিবার-পরিজন ছেড়ে আলাদা বাস করা শুরু করেছে। জানলে আপনার চোখেও হয়তো জল চলে আসবে! ১৯৯০ সালের দিকে এসব নারীরা ব্রিটিশ সৈন্য দ্বারা ধর্ষনের শিকার হন। প্রায় ১,৪০০ সাম্বুরু নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন।

পরিবারের লোকেরা তাদেরকে আর ঘরে ঢুকতে দেননি। বাধ্য হয়ে আশ্রয় খুঁজতে খুঁজতে, সব ধর্ষিতা নারীরা মিলে তৈরি করেন এক গ্রাম। এ ছাড়াও পরবর্তীতে অনেক স্বামীহীন এবং নির্যাতিত নারীরাও আশ্রয় খুঁজে নিয়েছেন উমোজা গ্রামে।

jagonews24

১৯৯০ সাল থেকে ১৮ জন সাম্বুরু নারী নিয়ে এই গ্রামটির সূত্রপাত হয়। এটি এমন একটি গ্রাম যেখানে শুধুমাত্র নারীদের বাস এবং তাদেরই শাসন চলে। এ গ্রামের বিশেষত্ব হলো, এখানে কোনো পুরুষ প্রবেশ করতে পারে না। দেশটির নাম কেনিয়ার, উমোজা নামের একটি গ্রাম। নারীদের এ গ্রামটি কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির নিকটে।

উমোজার নারীরা বেশ সৌখিন। তারা পুঁতি দিয়ে বিভিন্ন গয়না তৈরি করে থাকেন। যেগুলো পর্যটকরা ঘুরতে গিয়ে কিনে আনেন। এসব গয়না বিক্রি করে দিব্যি সংসার চালান উমোজার নারী। এ ছাড়াও কৃষি কাজ, পশু পালনসহ সন্তানদের দেখভাল সবই দু’হাতে সামলান উমোজার নারীরা।

jagonews24

উমোজা গ্রামের এক বাসিন্দা রোজালিনা। তিনিও ঘরের কাজ করেন আবার গয়নাও তৈরি করেন। রোজালিনা যখন উমোজা গ্রামে এসেছিলেন তখন তার বয়স মাত্র ৩ বছর। এখানে ৫০ জন নারী তাদের বাচ্চাদের নিয়ে একসঙ্গে খড়ের ঝোপে বসবাস করে।

এ গ্রামের নারীদের লক্ষ্য দারিদ্রতা এবং নিষিদ্ধ নারীদের জীবনধারণের উন্নতি। পরিবার কর্তৃক নারীদের ত্যাগ করার সমস্যা মোকাবেলা করা। তারা নিজেরাই দশে মিলে কাজ করে যাচ্ছেন, নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়নে।

প্রথম থেকেই উমোজার নারীরা, তাদের গ্রামে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছেন। পুরুষদের উমোজা গ্রাম দেখার অনুমতি থাকলেও গ্রামে রাত্রিযাপন করার অনুমতি নেই। যদি কোনো আগন্তুক পুরুষ জোরপূর্বক গ্রামে ঢোকার চেষ্টা করেন, সেক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশকে জানানো হয়।

jagonews24

নির্যাতিত নারীদের আবাসস্থল উমোজা। এ গ্রামের সব নারীই সাম্বুরু সম্প্রদায়ের। যদি কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে এ গ্রামে আশ্রয় খুঁজেন; তাহলে উমোজা তাদেরকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে। এখানে বসবাসরত নারীরা ৯৮ বছর বয়সী থেকে ৬ মাস বয়সী কিশোরী পর্যন্ত রয়েছে।

অনেক গর্ভবতী নারীরাও এখানে বাস করেন। এমন অনেক মহিলা আছেন যারা স্বামীর মৃত্যুর পরে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। উমোজার শিশুদের মধ্যে বেড়ে ওঠা পুরুষরা গ্রামে রাত্রিযাপন করতে পারে। ২০০৫ সালে, উমোজা গ্রামে ৩০ জন নারী এবং ৫০ জন শিশু বাস করত।

উমোজার বাসিন্দারা ঐতিহ্যবাহী সাম্বুরু কারুকাজ করে থাকে। যা তারা উমোজা ওয়াসো মহিলা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে বিক্রি করে কারুশিল্পগুলোর মধ্যে রঙিন পুঁতির মালা তৈরি করে। নারী পর্যটকদের জন্য একটি ক্যাম্পসাইটও চালান এবং প্রতিটি নারী তাদের আয়ের ১০ শতাংশ বিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য, কর হিসাবে গ্রামে দান করে।

উমোজা গ্রামে মহিলারা সম্পূর্ণ স্বাধীনতায় সুখে বসবাস করেন। এখানে তাদের কোনো কাজের অনুমতি নিতে হয় না। উমোজা গ্রামের নারীরা বর্তমানে সেখানকার জমির মালিক। তাদের রীতি-নীতি ও শাসনেই চলে পুরো গ্রাম।
প্রশাসনও তাদেরকে মূল্যায়ন করেন। পর্যটনবান্ধব এ এলাকায় অনেক নারী-পুরুষরাই ঘুরতে যান। যদিও নারীদেরকেই বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয় উমোজা গ্রামে।

  • সর্বশেষ - ভ্রমণ