ময়মনসিংহ, , ১৩ কার্তিক ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

দেবব্রত সেনের গল্প ‘দোল’

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

দেবব্রত সেনের গল্প ‘দোল’

গত রাতের বাসি তরকারি সব এক জায়গায় করে রেখেছে কাজের মেয়ে মিনু। মায়ের কথামতো বিধান ওইগুলো নিয়ে ঠাকুর দালান পার হয়ে উত্তরের উঠানের উত্তর-পূর্ব পাশে রাখা বড় মালসায় ঢেলে দিলো। এটা বাঘার খাবার স্থান। লেজ নাড়তে নাড়তে বাঘাও পেছন পেছন চলে এলো। কলতলায় হাত ধুয়ে বিধান শেফালি গাছটার নিচে এসে দাঁড়ায়। এখান থেকে বাড়ির রাস্তা পার হয়ে পুকুর পাড়ে দোল মন্দির পর্যন্ত দেখা যায়। দোল মন্দিরের চাতালে শিবুকাকুকে দেখা যাচ্ছে। ভোরে সূর্য ওঠার আগেই চলে এসেছে শিবুকাকু। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ সব শেষ করতে হবে আজ সন্ধ্যার মধ্যে। কাল দোলযাত্রা, আজ সন্ধ্যায় হোলিকা। নাড়া পোড়ানোর জন্য সব তৈরি করে রেখেছে আগেই। ভীষণ ব্যস্ত দেখাচ্ছে শিবুকাকুকে। ঝলমলে সকালটাতে বিধানও ভেতরে ভেতরে বেশ পুলকিত। মলয় বাতাসে ভেসে আসা কচি কিশলয়ের গন্ধে, নরম ঘাসের গন্ধে অন্যরকম এক শিহরণ জাগে বিধানের মনে।

উচ্ছিষ্ট বাসি ভাত-তরকারি সব চেটেপুটে খেয়ে বাঘা তার লম্বা জিহ্বা বের করে ঠোঁট চাটতে ফিরে এলো বিধানের কাছে। বেশ আহ্লাদিত আর কৃতজ্ঞ মনে হচ্ছে ওকে। শ্লথ-পায়ে হেঁটে এসে বিধানের পায়ের নিচের অংশটাও চেটে দিলো। খুশি-খুশি গলায় কেমন একটা শব্দ করে কুকুরটা বিধানের চোখে চোখ রাখলো। দুই পা উপরে তুলে দুই পায়ে ভর করে বিধানকে জড়িয়ে ধরলো। হাত দিয়ে মাথায় একটু স্পর্শ করতেই ঘেউ ঘেউ করে বিধানকে কৃতজ্ঞতা জানালো। তারপর ভোঁ-দৌড় সামনের পুকুর পাড়ের দিকে। কিছুদূর গিয়ে থমকে দাঁড়ায়, ঘেউ ঘেউ শব্দ করে দু’চার বার। কিছুটা পিছিয়ে এসে বিধানকে পর্যবেক্ষণ করে নেয়, আবার ঘেউ ঘেউ শব্দ করে এগিয়ে যায়। আ-আ-উ শব্দ করে বিধানকে ডাক দেয়। বিধান এবার ধীর পায়ে এগোতে থাকে। পেছনে বিধানকে আসতে দেখে আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেগে দৌড়ে একদম পুকুরের দক্ষিণ-পূর্ব কোনের দোল-মন্দিরের চাতালে গিয়ে দাঁড়ায় বাঘা।

শিবুকাকু সকাল থেকেই মন্দির পরিষ্কারে ব্যস্ত। প্রতিবছর দোলের আগের দিন সকাল থেকে শিবুকাকু কোমর বেঁধে লেগে পড়ে দোল-মন্দির, চাতল পুকুরঘাট, শ্মশান পরিষ্কারের কাজে। সেই ছোটবেলা থেকেই বিধান দেখে আসছে। দোলের এই তিন দিন শিবুকাকু একবারের জন্যও নিজের বাড়িতে যায় না। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, স্নান সব এ বাড়িতে।

বাঘাকে চাতালের উপর দাঁড়াতে দেখে তেড়ে যায় শিবুকাকু, যা যা, দূর হ।

বাঘা একটু অপ্রস্তুত হয়, বোধ হয় একটু শরমও পায়। বুঝতে পারে না সে কী ভুল করলো। মুখ নিচু করে সে চাতাল থেকে নেমে গিয়ে উল্টা হাঁটতে থাকে। একটু বুঝিবা বিরক্তও হয়। এক পা দুই পা করে বাঘা ঘাটলার দিকে বিধানের কাছেই আসতে থাকে। হয়তো বা শিবুকাকুর নামে নালিশ করতে চায়। অন্যদিন চাতালে সে ঘোরে, শুয়ে থাকে, কেউ তাকে কিছু বলে না। আজ কেন তাকে এভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দিলো সে বুঝতে পারে না।

শিবুকাকু নিজে নিজে বকাবাদ্য করতে করতে জলভর্তি বালতিটা ঢেলে দিলো, যেখানে কুকুরটি উঠে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর বিধানের দিকে ছুঁড়ে দিলো একটা উপদেশবাণী, ‘কুত্তাটারে বেশি আশকারা দিয়েন না ছোটবাবু। বেশি খচ্চর আর ইতর আছে। হরহামেশা এই জায়গায় ঠিক এই জায়গাটাতেই সে পা তুলে পেচ্ছাব করে।’

ডানহাতের তর্জনি দিয়ে শিবুকাকু তুলসি গাছটা নির্দেশ করে। বিধান বুঝতে পারে কুকুরটার এ কাজের জন্যেই শিবুকাকু বাঘার ওপর বেশি ক্ষ্যাপা। বিধান মিটিমিটি হাসতে থাকে, মুখে কিছুই বলে না। বিধান বোঝে, বলে কোনো লাভও নেই। বড় একরোখা মানুষটি কিন্তু ভীষণ বিশ্বস্ত, সৎ আর অসীম সাহসী। এই একটি জায়গায় বাঘার সাথে খুব মিল শিবুকাকুর। হয়তো এ কারণেই পিতৃদেব শিবুকাকু আর বাঘাকে ভীষণ ভালোবাসে।

গজগজ করতে করতেই শিবুকাকু বালতি বালতি জল তুলে ছোট্ট দোল মন্দিরটার চারপাশ আর চূড়ায় দূর থেকে সজোরে নিক্ষেপ করতে লাগলো। ঘাটলায় বসে পরিচ্ছন্নতা অভিযান অবলোকন করতে করতে কেমন আনমনা হয়ে গিয়েছিল বিধান।

পেছন থেকে কে যেন তার চোখ টিপে ধরে, কোমল-নরম দুটি হাত। প্যারিস পারফিউমের মৃদু মাদকতায় মুখরিত বাতাসে অজানা একটি কম্পন ছড়িয়ে দিয়েছে সেই স্পর্শ। বিধানের বুঝতে বাকি থাকে না, তার পেছনে গায়ের সাথে গা লাগিয়ে কে তার চোখ টিপে ধরেছে।

অনুরাধা, বিধানের বাবা সুবীর চৌধুরীর বন্ধু হরিপদ দত্তের একমাত্র কন্যা। ইতালির মিলানে থাকে।

‘কভিড-১৯’ আতঙ্কে চীনের পরে ইতালি দিশাহারা হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে মাতৃহীনা একমাত্র কন্যাকে নিয়ে গত পরশু ভোরবেলার ফ্লাইটে দেশে আসে। তাঁদের তেমন কোন আত্মীয়-স্বজন নেই দেশে। যাঁরা আছে তাঁদের সাথেও তেমন যোগাযোগ না থাকায় বন্ধুর বাড়িতেই আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলো।

ছোটবেলার বন্ধুকে কাছে পাওয়ার আনন্দে বিধানের বাবাও খুব খুশি। নিজেই যেতে চেয়েছিলো এয়ারপোর্ট বন্ধু আর বন্ধু তনয়াকে রিসিভ করার জন্য। শেষমেশ বিধানের মায়ের নিষেধে নিবৃত্ত হলো। বিধান একাই এয়ারপোর্ট থেকে তাঁদের নিয়ে এসেছে ড্রাইভ করে। অন্যসময় সে ড্রাইভিংটা অ্যাভয়েড করে, খুব ঠেকায় না পড়লে স্টিয়ারিংয়ে সে বসেই না। এতবছর পর অনুরাধার আগমন তাকেও কি শিহরিত করেনি!

অনুরাধার সাথে প্রথম দেখা হওয়ার স্মৃতিটা এত বছর পরও অমলীন হয়ে আছে বিধানের মনের গহীন কোণে। বিধানকে একমুঠো আবীর দিয়ে রাঙিয়ে দিয়েছিলো অনুরাধা। সদ্য কৈশোরে পড়া বিধান সেদিন থরথর কেঁপে উঠেছিল ঐশ্বরিক কোনো আনন্দে। সেদিন অনুরাধা তার কোমল ছোট্ট দুটি হাতে বিধানের মুখমণ্ডলই শুধু রাঙিয়ে দেয়নি। রাঙিয়ে দিয়েছিল তার তনুমন, তার ভাবনার জগৎ, তার চেতনার অন্তরাত্মাকে।

সেবার দোলের দিনে বিধানরা বাড়িতে আসতে পারেনি। সুবীর চৌধুরী জরুরি কাজে আটকে গিয়েছিলো চট্টগ্রামে। সেই একবারই। যেখানে যার যত কাজ থাকুক দোলের আগের দিন সবাই সব ফেলে চলে আসে বাড়িতে। এটাই চৌধুরী বাড়ির পরম্পরা। বিধান তার ঠাকুর দাদা শিবনারায়ণ চৌধুরীর কাছে শুনেছিল, তার ঠাকুর দাদা জমিদার গঙ্গা নারায়ণ চৌধুরীর আমল থেকেই এ প্রথা চালু আছে চৌধুরী বাড়িতে।

ঠাকুরদা শিবনারায়ণ চৌধুরীর কাছেই বিধান শুনেছে, কৃষ্ণ তার যৌবনে হতাশ ছিলো নিজের শ্যাম বর্ণের কারণে। কৃষ্ণ এই ভেবে চিন্তিত থাকতো যে, গৌর বর্ণের রাধা ও অন্যান্য গোপীরা তার শ্যামল-বর্ণের কারণে তাকে অপছন্দ করবে এবং তার কাছে আসবে না। পুত্রকে এ চিন্তা থেকে মুক্ত করতে মা যশোদা পুত্রের গায়ে আবীর ছুঁয়ে দেয় এবং বলে, কৃষ্ণ যেন এই আবীর রাধার মুখে লাগিয়ে দেয়। এতে কৃষ্ণ আর রাধার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। কৃষ্ণ মাতৃ আজ্ঞা পালন করে শ্রীরাধার গায়ে আবীর ছুঁইয়ে দেয় এবং তাদের মধ্যে প্রেমের বন্ধন তৈরি হয়ে যায়।

বিধানের ঠাকুম্মা মৃন্ময়ী বালা শুনিয়েছে আবার অন্যকথা। ঠাকুম্মার কাছে শুনেছে, দৈত্যরাজ হিরন্যকশিপু অমরত্ব লাভ করার বাসনায় কঠোর ধ্যানে মগ্ন হলে, তাকে পাঁচটি বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়। প্রথমত তাকে কোনো মানুষ হত্যা করতে পারবে না। দ্বিতীয়ত তাকে কোনো প্রাণিও হত্যা করতে পারবে না। তৃতীয়ত তাকে ঘরে হত্যা করা যাবে না। আবার তাকে বাইরেও হত্যা করা যাবে না। চতুর্থত তাকে দিনে কিংবা রাতেও হত্যা করা যাবে না। পঞ্চমত তাকে জল-স্থল-অন্তরীক্ষে কোথাও হত্যা করা যাবে না। এতসব ক্ষমতা পেয়েও হিরন্যকশিপু হয়ে ওঠে ভীষণ অহঙ্কারী স্বেচ্ছাচারী এবং নিজেকে দেবতা বলে মনে করতে শুরু করে। সে চাইতো মানুষ তাকে পূজা করুক। কিন্তু তার পুত্র বিষ্ণুভক্ত প্রহলাদ পিতার এমন ভাবনাকে অস্বীকার করে বিষ্ণুর আরাধনায় নিয়োজিত হলে রাগে ক্ষোভে পুত্রকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিল হিরন্যকশিপু। শরনাপন্ন হলো আপন ভগ্নি হোলিকার নিকট। হোলিকা নিজেও এক বিশেষ ক্ষমতার অধিকারিণী, অগ্নি তাকে হত্যা করতে পারবে না।

ভাইবোন মিলে ষড়যন্ত্র করে পুত্র প্রহলাদকে বোন হোলিকার কোলে বসিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলো। দাউ দাউ আগুনের লেলিহান শিখায় হোলিকা ভষ্ম হয়ে গেল কিন্তু প্রহলাদ হরিনাম করতে করতে বিষ্ণুর কৃপায় অক্ষত অবস্থায় বের হয়ে এলো অগ্নিকুণ্ড থেকে। হিরন্যকশিপু এতে আরও ক্রোধান্বিত হয়ে নিজেই আবার পুত্রকে হত্যা করতে উদ্যত হলো। ভক্তকে রক্ষা করার জন্য বিষ্ণু নিজে অর্ধমানব অর্ধসিংহ রূপে, গোধূলি বেলায় যখন না রাত না দিন, হিরণ্যকশিপুর বাড়ির দুয়ারের উপর, যা ঘরের বাইরে কিংবা ভেতরে নয়, নিজের কোলের ওপর নিয়ে যা জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে কোথাও নয়, হিরণ্যকশিপুকে বধ করেন। আর এ ঘটনা ফাল্গুনী পূর্ণিমার আগের দিন। এ জন্যই দোলের আগের দিন হোলিকা বা নাড়াপোড়ানো মাধ্যমে অসুর বধ করা হয়।

মিথ যা-ই হোক, চৌধুরী বাড়িতে দোল মানে শুধু কোনো উৎসব নয়, ‘হোলিকা’ কিংবা ‘রঙখেলা’ নয়- পরস্পরের মধ্যে ভাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করার মাধ্যমে নবচেতনা এবং উদ্দীপনায় জীবনকে উপলব্ধি করার আহ্বান। বিধানের বাবা সুবীর চৌধুরী আজও ধরে রেখেছে সেই পরম্পরা। শুধু ওই একবারই দোলের সময় তাঁর বাড়ি আসা হয়নি। এ নিয়ে সে এখনো অনুশোচনা করে।

দোলের দিন সকালবেলায়ই বাবা বের হয়ে গেলে বিধান খুব মন খারাপ করে বসেছিল নিজের ঘরে। প্রতিবার দোলযাত্রার কয়েকদিন আগেই তারা বাড়ি চলে আসতো। বাড়িভর্তি হয়ে যেতো, সব ভাই-বোন একসাথে মিলে হোলিকা পোড়াতো আগের দিন। দোলযাত্রার দিন সকালবেলা থেকেই নানা আয়োজন, কী আনন্দ! বিধানের মন খারাপ দেখে মা তাকে সাথে নিয়ে সেদিন ডিসি হিলের পাশে নন্দন কানন রাধাকৃষ্ণ আশ্রমে এসেছিল। ওকে একপাশে বসিয়ে রেখে মা ভিড় ঠেলে যখন মন্দিরে প্রবেশ করেছে, তখনই ঘটলো ঘটনাটা। ধবধবে সাদা পোশাকে তুলতুলে ছোট্ট একটি মেয়ে তার সামনে এসে বললো,
‘তুমি এখানে একা বসে আছো কেন চুপ করে? তোমার কি খুব মন খারাপ?’
মিষ্টি হাসি মুখে নিয়ে উজ্বল বড় বড় চোখ দুটি চেয়ে আছে তার দিকে।
‘কী হলো, বললে না তো, তোমার কি মন খারাপ?’
‘মা মন্দিরের ভেতরে গেছেন। আমরা বাড়ি যেতে পারিনি এবার। বাবার জরুরি কাজ পড়েছে তাই। আমাদের বাড়িতে অনেক সুন্দর দোল হয়। এখানে আমার সাথে রং খেলার কেউ নেই।’
‘কে বলেছে নেই! এই তো আমি আছি। আমার নাম অনু। আমি তোমার বন্ধু। এসো আমরা রং খেলি।’ বলেই মুঠোভর্তি আবীর মেখে দিলো বিধানের মুখে।
বিধান একটু আড়ষ্ট হয়েই ছিল। তারপরও বললো, ‘এই নাও’। বলে অন্যহাতের মুঠো খুলে দিলো অনু।
এক চিমটে রং ছোট্ট তুলতুলে হাতের তালু থেকে নিয়ে মেয়েটির মুখে লাগাতে লাগাতে বিধান বললো,
‘আমার নাম বিধু। তুমি খুব মিষ্টি তো! তোমার সাথে কেউ আসেনি?’
‘এসেছে তো। আমার মা এসেছে, বাবা এসেছে, ভজুকা এসেছে। ভজুকা কে জানো?’
‘বা রে! না বললে জানবো কী করে?’
‘ভজুকা আমাদের রান্নার লোক, আমাদের সাথে থাকে। জানো? ওর না কেউ নেই। আমি নাকি ওর সব। ও আমাকে স্কুলে নিয়ে যায় কাঁধে চড়িয়ে। ও ঘোড়া সাজে। ওই যে মা এসে গেছে।’ বলেই দৌড় লাগায় অনুরাধা।

বিধান তাকিয়ে দেখে তার মা আর একজন মহিলা মন্দির সংলগ্ন বড় বটগাছটি পার হয়ে এদিকেই আসছে। অনুরাধা গিয়ে মহিলাটিকে জড়িয়ে ধরেছে, আবার ওকে দেখিয়ে কী কী যেন বলছে। কাছে এসে মা বললো, ‘এঁকে প্রণাম কর, বিধু। তোমার কাকিমা ইনি। হরিপদ কাকুর স্ত্রী। ইতালিতে থাকেন।’ বিধান বাবার কাছে শুনেছে অনেকবার তাঁদের কথা। ছোটবেলায় বাবার বাল্যবন্ধু হরিপদ কাকুর বাবা মারা গেলে অনেক অভাবে তাঁদের দিন কাটতো। ঠাকুরদা না কি বাবার সাথে সাথে হরিপদ কাকুর পড়ার খরচও চালাতো।

বিধানের বাবা সুবীর চৌধুরী আর হরিপদ দত্ত কাকু ছিলো হরিহর আত্মা। ঠাকুম্মার কাছেই শুনেছে বিধান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দুই জনে একসাথেই একই বিষয় অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেছে। এমনকি দুইজনে একই রুমে থেকেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোটা সময়। হরিপদ কাকু খুব মেধাবী ছিলো, ক্লাসে সবসময় প্রথম। বাবা থাকতো দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় পজিশনে। পিতার মৃত্যুর পর সহায় সম্বলহীন হরিপদ কাকুর লেখাপড়া যখন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে, তখন ঠাকুরদা হরিপদ কাকুর সব দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেয়। বিশ্বদ্যিালয়ের পাঠ শেষ করে বাবা চট্টগ্রাম চলে এলে হরিপদ কাকু থেকে গেলো ঢাকায়। মাঝে সাঝে বাড়িতে এলেও যোগাযোগটা ক্রমশ শিথিল হয়ে যায়। তারপর কী একটা চাকরি নিয়ে চলে যায় ইতালিতে।

বিধান মায়ের কথামতো কাকিমার পায়ের স্পর্শ নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই দেখে ইউরোপিয়ান হ্যাট মাথায় লম্বা চওড়া এক ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে এলো। তাঁকে একটু বিব্রত মনে হলো। ভদ্রলোককে মা হাতজোর করে প্রণাম করলো। কুশল বিনিময়ের মাঝেই বিধানকে ইশারা করলো, তাঁকে প্রণাম করতে।

ইনিই তবে হরিপদ কাকু। মাথা নিচু করে প্রণাম করতে যেতেই জড়িয়ে তুলে নিলো কোলে। বিধানকে কোলে তুলে নেওয়ার দৃশ্য দেখে অনুরাধা হাততালি দিতে দিতে কী যেন বলতে লাগলো ইংরেজিতে। বিধান ভীষণ লজ্জা পেয়ে মিশে গিয়েছিল হরিপদ কাকুর বুকের সাথে। অজানা এক আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল বিধান।

সেদিনের সেই অনুভূতি আর আজকের অনুভূতির মধ্যে কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পায় বিধান। চোখ থেকে অনুরাধার হাত না সরিয়েই স্থির থাকে বিধান। অনুসন্ধান করতে থাকে সেই মিলটা কোথায়। হয়তো বা পেয়েও যায়। অনেকক্ষণ এভাবে চোখ ধরে রাখার পর অনুরাধা আস্তে আস্তে হাতটা সরিয়ে নেয়। পেছন থেকে আস্তে আস্তে এসে বিধানের মুখোমুখি হয়ে বসে পড়ে ঘাটলার ওপর।
‘তুমি এখানে একা বসে আছো কেন চুপ করে? তোমার কি খুব মন খারাপ?’
হাসতে হাসতে অনুরাধা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। প্রথম দেখা হওয়ার দিনের সেই প্রশ্নটি।

বিধানের মনে আচানক এক শিহরণ দোল দিয়ে যায়, সে দোলায় আন্দোলিত হয় বিধানের ভেতর-বাহির। আবীর রঙে রাঙিয়ে দিয়ে যায় বিধানের সমস্ত মুখ। এতবছর পরও অনুরাধা মনে রেখেছে তবে সেই দিনের কথা। তবে কি অনুরাধাও শুভ্র ভোরের প্রথম আলো গায়ে মেখে ভেসে চলেছে সহযাত্রী হয়ে বিধানের সেই স্বপ্নের তরীতে। বিধান ক্রমশ মিশে যাচ্ছে কচি পল্লবের গন্ধে মুখরিত বাতাসে, ভিজে যাচ্ছে পাহাড়ি ঝরনার শীতল ধারায়।

লেখক: গল্পকার।

  • সর্বশেষ - সাহিত্য