, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ অনলাইন সংস্করণ

জাবি অধ্যাপকের বিরুদ্ধে গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠন

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

জাবি অধ্যাপকের বিরুদ্ধে গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ তারেক চৌধুরীর বিরুদ্ধে গবেষণা জালিয়াতি ও সহকর্মীর সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বুধবার অভিযোগকারী ও বিভাগটির অধ্যাপক ফরিদ আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এসব বিষয় নিশ্চিত করেছেন। এর আগে, গত বছরের ২৩ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রেজিস্ট্রার বরাবর অভিযোগপত্র জমা দেন অধ্যাপক ফরিদ আহমেদ।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০১১ সালে দর্শন বিভাগের একাডেমিক জার্নাল কপুলা (Copula) থেকে ‘ঈশ্বরের স্বরূপ প্রসঙ্গে ধর্মীয় ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি : একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন অধ্যাপক মুহাম্মদ তারেক চৌধুরী। ওই প্রবন্ধটিতে তিনি অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলামের পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস ‘থেলিস থেকে হিউম’ গ্রন্থের ৩৩, ৩৪, ৬৩, ৬৪, ১০৪, ১০৫, ১৩০, ১৩১, ১৪২, ১৪৩, ২৫১, ২৬৯, ২৯৬, ৪৩৮, ৪৫০, ও ৪৫১ পৃষ্ঠা থেকে ১৩’শ ৪৩ শব্দ জালিয়াতি করেছেন। যা তার মূল প্রবন্ধের প্রায় ১৯ শতাংশ। যেখানে নিয়মানুযায়ী একটি গ্রন্থ থেকে মাত্র ২ শতাংশ নেওয়া যায়। অথচ তারেক চৌধুরী এই গবেষণা প্রবন্ধটি ব্যবহার করে বিভাগের অধ্যাপক পদে পদোন্নিত লাভ করেন বলে দাবি করেন অধ্যাপক ফরিদ আহমেদ।

এ ছাড়া, তারেক চৌধুরী তার ওই প্রবন্ধে অধ্যাপক অর্জুন বিকাশ চৌধুরী রচিত মডার্ন বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড থেকে ২০০৩-২০০৪ সালে প্রকাশিত ভারতীয় দর্শন গ্রন্থের ১১৬-১১৭ পৃষ্ঠা থেকে ৭২ শব্দ এবং প্রমোদবন্ধু সেনগুপ্ত রচিত ব্যানার্জি পাবলিশার্স থেকে ২০০৭ সালে প্রকাশিত ‘পাশ্চাত্য দর্শনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আধুনিক যুগ’ গ্রন্থের ৯৮-১০২ পৃষ্ঠা থেকে ৩৭৯ শব্দসহ প্রায় ২ হাজার ২ শব্দ চুরি করেছেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে। যা শতকরা হিসাবে ২৯ শতাংশ। এ ছাড়, তিনি প্রবন্ধটিতে ১৮৫ শব্দ কোট (quote) করেছেন।

অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়, অধ্যাপক মুহাম্মদ তারেক হিন্দু ধর্মে বর্ণিত ঈশ্বরের গুণাবলী সম্পর্কে লিখছেন ১৫৪ পৃষ্ঠায়। এই সব তথ্য রাধাগোবিন্দ নাথ থেকে যা ই. সি. ডিমোক (E.C. Dimock) রচিত দ্য প্লেস অব দ্য হিডেন মুন (The Place of the Hidden Moon) গ্রন্থের ফুট নোটে ১৩২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে। পুরো প্রবন্ধে আরও যেসব বিষয় অধ্যাপক তারেক চৌধুরী লিখেছেন তার উৎস নির্দেশে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়। অধ্যাপক তারেক সেসবও চুরি করে থাকতে পারেন বলে দাবি করেন অধ্যাপক ফরিদ আহমেদ।

এ ছাড়াও অভিযোগপত্রে অধ্যাপক মুহাম্মদ তারেকের বিরুদ্ধে বিভাগের সহকর্মীদের সঙ্গে অশোভন ও অশিক্ষিতসুলভ আচরণ করার অভিযোগ তোলা হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়, বিভাগের গবেষণা সেমিনারে এমফিল-পিএইচডি গবেষকদের ‘চোর’ বলে রায় দেন অধ্যাপক তারেক চৌধুরী।এমনকি ২০২১ সালে এক সভায় বিভাগের আরেক শিক্ষক মোহাম্মদ উল্লাহকে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ বলে ব্যঙ্গ করেন অধ্যাপক তারেক। এ ছাড়া, তিনি বিভিন্ন সময় মোহাম্মদ উল্লাহকে ‘বেয়াদপ’সহ নানা আক্রমণাত্মক কথা বলেন। সর্বশেষ, তিনি গত বছরের ২০ মার্চ দর্শন বিভাগের সেমিনার কক্ষে অধ্যাপক ফরিদ আহমেদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে, গত ১ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ এক সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাপক তারেক চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগটি আমলে নিয়ে ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জাবি কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানকে সভাপতি করে গঠিত এ কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহেদুর রশীদ ও বাংলা বিভাগের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ কাহিলি। এ ছাড়া, কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রশাসন ২) এ বি এম আজিজুর রহমান। ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে এ কমিটিকে সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অভিযোগপত্রে আমার সবগুলো দাবি সত্য। শুধু তাই নয়, উনার আরও একটি প্রবন্ধে ৬০ শতাংশ লেখা কপি করার তথ্য পাওয়া গেছে। যা ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়েছে, এটা অভিযোগপত্রে না থাকায় এখন বলতে চাচ্ছি না। তবে উনি একজন শিক্ষক হয়ে কীভাবে আরেকজন শিক্ষককে মারতে যেতে পারেন? শুধু মোহাম্মদ উল্লাহ নয়, আমার সাথেও অশোভন আচরণ করেছেন তিনি। অথচ, আমি তারও শিক্ষক। আমি একান্ত নিরুপায় হয়ে নিরাপত্তাহীনতা থেকে এই অভিযোগ দাখিল করেছি। প্রশাসন এখন যা ব্যবস্থা নেওয়ার নেবে।’

তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক মুহাম্মদ তারেক চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যেহেতু এটা তদন্তাধীন বিষয়, তাই এসব অভিযোগের বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নাই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও তদন্ত কমিটির উপর আমার আস্থা আছে। কর্তৃপক্ষ তদন্ত শেষে যা পাবে, তার ব্যবস্থা নেবে। বিভাগটির সভাপতি অধ্যাপক এ এস এম আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, ঘটনাটি শুনেছি, তবে একজন শিক্ষকের সাথে অসদাচরণ করলো। কিন্তু তিনি অভিযোগ না দিয়ে তার পক্ষে কেন আরেকজন শিক্ষক অভিযোগ করলো, বুঝলাম না। বিভাগের সভাপতি হিসেবে এ বিষয়ে আমার মন্তব্য করা ঠিক হবে না। এটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দেখবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এ ঘটনায় আমাকে তদন্ত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। এখন মাত্র আপনার কাছ থেকে শুনলাম। আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি। এ বিষয়ে খোঁজ নেবো।

  • সর্বশেষ - শিক্ষাঙ্গন