, ১ ভাদ্র ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

গাফ্ফার চৌধুরী ছিলেন সত্য স্তম্ভের মহীরুহ!

  ফিচার ডেস্ক

  প্রকাশ : 

গাফ্ফার চৌধুরী ছিলেন সত্য স্তম্ভের মহীরুহ!

মো. মাহমুদ হাসান

পত্রিকার পাতায় উপ-সম্পাদকীয় আর মতামত কলাম পড়ার অভ্যাসটা ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল মনে নেই। সম্ভবতঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেষ ক্লাস থেকেই আমি নিয়মিত পত্রিকার পাঠক। তখন ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকা অজো পাড়া গাঁয়ে পৌঁছাতে প্রায় দু’দিন লেগে যেতো। আমার স্কুল শিক্ষক বাবা নিয়মিত দুটো পত্রিকা রাখতেন, ‘সংবাদ’ আর ‘বাংলার বাণী’।

কেন তিনি এ দুটো পত্রিকার নিয়মিত পাঠক ছিলেন, তখন সেটি বুঝতে না পারলেও বছর কয়েক পরে ঠিকই বুঝেছিলাম। আমার মা-বাবা দু’জনেই নিয়মিত খবরের কাগজ পড়তেন। ‘পাঠক’ বললে বোধ করি ভুল হবে, উনারা দু’জনেই ছিলেন নেশাগ্রস্ত পাঠক। আর পত্রিকা হাতে নিয়েই প্রাধিকার ভিত্তিতে উপ-সম্পাদকীয় আর মতামত কলাম পড়তেন। উত্তরাধীকারের বৈশিষ্ট্যে কখন যে আমার মাঝেও এ নেশাটি জন্ম নেয় তা মনে নেই, তবে সেই ধারাটি আজও সমভাবেই বহমান।

পঁচাত্তর পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু অনুসারীদের জন্য চরম দুর্দিন ছিল। মহান জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে ‘বঙ্গবন্ধু’ লেখা বা বলা ছিল চরম শাস্তি যোগ্য অপরাধ। আর ‘জাতির জনক’ বললে তো শূলে চড়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হতো। তাই সে সময়ে কোনো গণমাধ্যম ও সংবাদপত্র শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে ‘জাতির জনক’ বা ‘বঙ্গবন্ধু’ লিখতেন না।

অনেক রথি-মহারথি যারা আওয়ামী লীগের অতি আপনজন হয়ে কলকাঠি নাড়েন, আজকের অনেক শেখ হাসিনা ভক্তরাও অতি সযত্নে সেই দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধু আর জাতির জনক শব্দ দুটিকে এড়িয়ে চলতেন। সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলো দুটো সংবাদ পত্র ‘দৈনিক সংবাদ’ আর ‘বাংলার বাণী’। সেন্সরের কারণে সংবাদে জাতির জনক না লিখতে পারলেও উপ-সম্পাদকীয় আর মতামত কলামে শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ছাপতেন।

বঙ্গবন্ধুকে যারা হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতেন, এক সময়ে তারা, খবরের কাগজে মহান নেতা মুজিবের নামের আগে অতি সংগোপনে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি খুঁজে বেড়াতেন। পত্রিকার কোনো নিউজে সেটি খুঁজে পাওয়া ছিলো আকাশ কুসুম, তবে দু’জন মহান মানুষের লেখায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি খুঁজে পাওয়া যেতো এর একজন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ খ্যাত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আর অন্যজন খ্যাতিমান সাংবাদিক এবিএম মুসা। সাধারণত মতামত আর উপ-সম্পাদকীয় কলামে উনাদের লেখা ছাপা হতো।

‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটিকে খুঁজে বেড়ানোর তাগিদ থেকেই হয়তোবা আমার প্রয়াত শিক্ষক পিতা নিয়মিত গাফ্ফার চৌধুরী আর এবিএম মুসার লেখা পড়তেন, আর এভাবেই আমিও একদিন নেশাগ্রস্ত পাঠক হয়ে উঠি। হলফ করে বলতে পারি রাজপথে জয় বাংলা বলে তথাকথিত রাজনীতিকরা যত সংখ্যক বঙ্গবন্ধু অনুসারী তৈরি করতে পেরেছেন, তার চেয়ে বহুগুণে বেশি বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক সন্তান তৈরি করেছেন লেখক, কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী।

দেশ বিভাগের পর থেকেই বাঙালি জাগরণের পক্ষে মতামত তৈরিতে গাফ্ফার চৌধুরী অসামান্য অবদান রেখেছেন। একুশের ভাবগাম্ভীর্যে তিনিই তো আমাদের ভিত্তিমূল। ভাষার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা কোথায় তিনি নেই? পঁচাত্তরের ট্রাজেডিকে দেশে বিদেশে তুলে ধরতে কোথাও তিনি কার্পণ্য করেছেন?

তিনি যা বিশ্বাস করতেন, নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে তাই লিখতেন। স্বৈরাচার, মৌলবাদ আর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তার সমকক্ষ সংগ্রামী কলম সৈনিক সাধারণের বিবেচনায় দ্বিতীয় জন আর নেই। দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকলেও জাতির দুর্দিনে সবসময়েই তিনি পাশে থেকেছেন। যে রাজনৈতিক আদর্শে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন, সেই দলের নেতা নেত্রীর ক্ষমতার বাড়াবাড়িতেও তার কলম থেমে যায়নি। দুর্নীতি আর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠ গাফ্ফার চৌধুরী নিজ বৈশিষ্ট্য গুণেই সর্বজন শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠেছিলেন।

হতাশ রাজনৈতিক নেতা, বঞ্চিত আমজনতার অনেকেই বিশ্বাস করতেন গাফ্ফার চৌধুরীর সুদৃষ্টি দুঃসময়কে বদলে দিতে পারে। তাই তো লন্ডনের বাসভবনে থেকেও তার নির্জন বসবাসের সুযোগ ছিলো না। সৌজন্য সাক্ষাৎ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম আর টেলি সংলাপে সর্বদাই তিনি ব্যস্ত সময় পার করেছেন।

নানা কারণেই অকপটে সত্য প্রকাশ যখন কঠিন হয়ে উঠছে, অচলপ্রায় শরীর নিয়েও তিনি চুপ করে থাকেননি। বিগত সংসদ নির্বাচনের আগে একটি দুর্নীতিমুক্ত রাজনৈতিক সরকার গঠনের লক্ষ্যে দু' শতাধিক বর্তমান সাংসদকে পরিবর্তন করে গ্রহণযোগ্য, সততার পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মনোনয়ন প্রদানের আহ্বান জানিয়ে তিনি আলোচনায় এসেছিলেন।

শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় নীতি, রাজনৈতিক আর জাতীয় স্বার্থেই গাফফার চৌধুরীর দৃষ্টি নিবন্ধ ছিল এমনটি নয়। অনেক স্থানীয় আর ব্যক্তিগত বঞ্চনা আর নিপীড়নের ঘটনাও তার দৃষ্টির বাইরে ছিলো না। তাই তো তিনি পুলিশ কর্তৃক কলা বাগানের মাঠ দখল আর পরীমনির দুঃসময়েও পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরীমনির পাশে দাঁড়ানোর ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, ‘দুর্দান্ত ক্ষমতাবান, দুর্নীতিগ্রস্ত অপশক্তির ভয়াল কালো থাবা থেকে বাঁচাতেই আমি তার পাশে দাঁড়িয়েছি’। চিরবিদায়ের আগে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে তিনি যখন অবিরাম সংগ্রামে নিয়োজিত, তখনো তিনি নিগ্রহের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন।

শৈশব থেকেই গাফ্ফার চৌধুরী আমার আদর্শ মহীরুহ হলেও, তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ বা কথা বলার সুযোগ আমার হয়নি। গেলো বছর ‘মাওলানা’ মুমিনুলকাণ্ডে বাংলাদেশ যখন উত্তপ্ত, সেই সময়ে ইত্তেফাকের মতামত কলামে একই দিনে উনার এবং আমার একটি লেখা প্রকাশ, এই মহান কলম গুরুর সঙ্গে আমার সংযোগ ঘটিয়ে দেয়।

প্রথম ই-মেইল আলাপে তিনি লিখেছিলেন, ‘শুভেচ্ছা। লেখাটি ভালো লেগেছে। যখন যা বিশ্বাস করবে, নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে, বিনা প্ররোচনায় তা লিখে যাবে। তোমার প্রিয় কোনো ক্ষমতাবানের রক্তচক্ষুও যেন তোমাকে নিবৃত্ত করতে না পারে। দোয়া করি, আমৃত্যু তোমার কলমটি যেন সচল থাকে’।

আজ গাফ্ফার চৌধুরী নেই। তার চিরবিদায় আমার কাছে কোনো ব্যক্তি বিশেষের মহাপ্রয়াণ নয়। তার শাহাদাত বরণ, আধিপত্যবাদ, উগ্র সাম্প্রদায়িকতাবাদ, আর দুর্নীতি, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সদাজাগ্রত এক মহান আদর্শিক মানুষের চিরবিদায়। পঁচাত্তরের বিয়োগাত্মক ঘটনায় চলে যাওয়া সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির রেখে যাওয়া একজন আদর্শিক সন্তানের অন্তিম যাত্রা। চারদিকে নানা অনিয়ম, অনাচার আর শোষণ, বঞ্চনার বিরুদ্ধে সদাজাগ্রত এক সত্য স্তম্ভের মহাপ্রয়াণ।

লেখক: কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

  • সর্বশেষ - ফিচার