, ২ কার্তিক ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

জেলেপল্লির শিশুদের পাশে হাতেখড়ি ফাউন্ডেশন

  ফিচার ডেস্ক

  প্রকাশ : 

জেলেপল্লির শিশুদের পাশে হাতেখড়ি ফাউন্ডেশন

দক্ষিণাঞ্চলের বলেশ্বর নদী তীরবর্তী জেলেদের সন্তানদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করছে হাতেখড়ি ফাউন্ডেশন। নিজস্ব সংস্কৃতি বিকাশ ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করতে বিভিন্ন সুযোগ সৃষ্টি করাসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষা, বৈষম্য দূরীকরণসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার আওতায় নিয়ে আসতে চেষ্টা করে যাচ্ছে সংগঠনটি। এছাড়াও বাল্যবিবাহ রোধ, ইভটিজিং প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা, বিনা মূল্যে রক্তদানসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজেও রয়েছে হাতেখড়ি ফাউন্ডেশনের বিচরণ।

সংগঠন সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৭ মার্চ হাতেখড়ি ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে ৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে জেলেপল্লির শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছেন তারা। জেলেশিশুদের জীবনমান উন্নয়ন, বিদ্যালয়মুখীকরণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতকরণ, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ অনগ্রসর শিশুর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, লিঙ্গবৈষম্য দূর করা, বাল্যবিবাহ রোধ ও সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হাতেখড়ি ফাউন্ডেশন বদ্ধপরিকর। এরই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে কিছু প্রজেক্টের অধীনে কাজ করছে সংগঠনটি।

jagonews24

প্রজেক্ট আলো
বলেশ্বর তীরবর্তী এলাকার গ্রামগুলোয় জেলেশিশুদের ২-৩ কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে যেতে হয়। পর্যাপ্ত বিদ্যালয়ের অভাব, যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশাসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার অভাবের কারণে বলেশ্বর তীরবর্তী এলাকার প্রায় ৮০ ভাগ জেলেশিশুই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। পাশাপাশি প্রায় ৯০ ভাগ শিশু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িত। বাল্যবিবাহ এখানকার স্বাভাবিক ঘটনা। জেলেপল্লির অধিকাংশ শিশু হয়ে ওঠে মৎস্যজীবী। মাছ ধরা, বিক্রি করা, ট্রলার বা নৌকা থেকে ঝুড়ি ভরে মাছ নামানো—সবই পারে। এসব কাজের পদ্ধতি শিখে নিতে হয়। এ শিক্ষা নিতে হয় পরিবার ও পেটের প্রয়োজনে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে এগিয়ে এসেছে হাতেখড়ি ফাউন্ডেশন।

জল ও জীবন
হাতেখড়ি ফাউন্ডেশনের প্রজেক্ট ‘জল ও জীবন’র একটি সিজন ‘এক টাকার মিনি মার্কেট’। এটি তাদের একটি নতুন আয়োজন। এক টাকার মিনি মার্কেট নিয়ে তারা উপস্থিত ছিলেন পিরোজপুরের বলেশ্বর নদী তীরবর্তী একটি জেলেপল্লিতে। জেলে পরিবারের শিশু শিক্ষার্থীরা শুভেচ্ছা মূল্য এক টাকার বিনিময়ে হাতেখড়ি ফাউন্ডেশনের অস্থায়ী স্টল থেকে কিনে নিয়েছে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ। তারা এক টাকার বিনিময়ে পেয়েছে একেকটি প্যাকেজ। যে প্যাকেজগুলোর মধ্যে ছিল বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ। প্যাকেজ দোয়েলে ছিল টিফিন বক্স, খাতা ও কলম, প্যাকেজ শাপলায় ছিল রং পেন্সিল, ছবি আঁকার খাতা, রুল, রাবার ও কাটার, প্যাকেজ ইলিশে ছিল স্কেল, খাতা, রুল, রাবার ও কাটার), প্যাকেজ কাঁঠালে ছিল পানির বোতল, খাতা ও কলম)। হাতেখড়ি ফাউন্ডেশনের এ কার্যক্রম চলবে। বিভিন্ন সময়ে এরকম অস্থায়ী স্টল নিয়ে হাতেখড়ি ফাউন্ডেশন হাজির হবে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলেপল্লিতে।

jagonews24

উপকূলে আনন্দ বিলাস
করোনার দীর্ঘ সময়ে জেলেপল্লির শিশুরা খুব একঘেয়ে হয়ে গেছে। স্কুল অনেকদিন বন্ধ। ফাউন্ডেশন সব সময় খোঁজ রাখেন। তাদের ও তাদের পরিবারের অনুরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে জেলে পরিবারের শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সীমিত পরিসরে খেলাধুলার আয়োজন করে। এপ্রিল মাসে বলেশ্বর নদী তীরবর্তী খেজুরবাড়িয়া জেলেপল্লির শিশুদের নিয়ে আয়োজন করে ক্রীড়া ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান সূচিতে ছিল পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, পবিত্র গীতা পাঠ, করোনা সম্পর্কে সচেতনতা বার্তা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রতিযোগীদের মাঝে খেলার জার্সি বিতরণ ও খেলাধুলায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ। সামাজিক কাজে অবদান রাখার পাশাপশি পিছিয়ে পড়া জেলে পরিবারের শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে ফাউন্ডেশনটি।

এক ব্যাগ ঈদ আনন্দ
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরের মতো এবারও জেলেশিশু ও অসহায় নবীন-প্রবীণদের জন্য আয়োজন করে ঈদসামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠান। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে কিছু জেলেপল্লির শিশু ও শ্রমজীবী অসহায় প্রবীণদের মাঝে বিতরণ করা হয় ঈদসামগ্রী। এবছর ঈদের আগে ২৭ রমজান বিকেল ৩ টায় পিরোজপুরের খেজুরবাড়িয়া জেলেপল্লির বেশসংখ্যক শিশুর হাতে এবং দ্বিতীয় ধাপে রাত ৮ টায় বরিশাল শহরের বেশসংখ্যক অসহায় শ্রমজীবী মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় ঈদসামগ্রী। এছাড়া সংগঠনের শুরু থেকে জেলেপল্লির শিশুদের বিনা মূল্যে পাঠদানের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে চমৎকার সব আয়োজন করে আসছে।

jagonews24

প্রদর্শনী
মহান বিজয়ের মাস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক শিশুতোষ চলচ্চিত্র দেখিয়েছে মঠবাড়ীয়ার কবুতরখালী-বটতলা বাজারে। প্রথমদিন বেশ কয়েকটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিশুতোষ চলচ্চিত্র দেখানো হয়। এতে জেলে পরিবারের ক্ষুদে শিক্ষার্থীসহ সবাইকে শিশুতোষ চলচ্চিত্র দেখার অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। এদিন ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, ‘দীপু নাম্বার টু’, ‘যুদ্ধশিশু’ ইত্যাদি দেখানো হয়। শিশুর সুস্থ মানসিকতার বিকাশে এ বিশেষ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।

ডিজিটাল ভিলেজ
উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমান যুগে প্রায় সব সম্প্রদায়ের শিশুই আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে। কিন্তু সেদিক থেকে জেলে সম্প্ৰদায়ের শিশুরা অনেকটাই পিছিয়ে। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সেদিক বিবেচনা করে যথাসম্ভব তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসার জন্য ডিজিটাল ভিলেজ নামে একটি প্রজেক্ট চালু করা হয়। যার মাধ্যমে জেলেশিশুরা কম্পিউটার চালানো, গেইমিং, ব্রাউজিংয়ের সুবিধা পাচ্ছে।

jagonews24

স্বপ্নপূরণ
বর্ষায় জেলেশিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়া অনেকটাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার আছে, যারা চাইলেও শিশুদের ছাতা কিনে দিতে পারেন না। বর্ষা মৌসুমে শিশুরা যাতে বিদ্যালয়ে যেতে পারে, সেজন্য ‘স্বপ্নপূরণ’ নামে একটি প্রজেক্ট চালু করা হয়। এর মাধ্যমে শিশুদের মাঝে রঙিন ছাতা বিতরণ করা হয়। প্রায় দেড় শতাধিক শিশুকে রঙিন ছাতা দেওয়া হয়েছে।

প্রজেক্ট হাসি
এ প্রজেক্টের মাধ্যমে সংগঠনটি শিশুদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ, যেমন- খাতা, কলম ও ব্যাগ ইত্যাদি দিয়ে থাকে। এপর্যন্ত প্রায় শতাধিক শিশুকে শিক্ষা উপকরণ দিয়েছে তারা।

শিক্ষাবার্তা
জেলে পরিবারগুলোর মাঝে সচেতনার খুবই অভাব। শিশুদের বিদ্যালয়ে না পাঠিয়ে বাবা-মা নানা ধরনের কাজে লাগিয়ে দেন। ফলে শিশুরা হয় অর্থ উপার্জনের উৎস। এ ধারণা থেকে বের হওয়ার জন্য চালু করা হয় প্রজেক্ট ‘শিক্ষাবার্তা’। যেখানে সংগঠনের সদস্যরা জেলে পরিবারকে সচেতন করা ও শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করার কাজ করেন।

jagonews24

প্রজেক্ট উৎসব
দেশের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করে। জেলে সম্প্রদায়ের শিশুরা এদিক থেকেও পিছিয়ে। আর্থিক সংকটের কারণে উৎসবের দিনগুলোয় তারা আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়। ‘উৎসব’ প্রজেক্টের মাধ্যমে জেলেশিশুদের নিয়ে বিভিন্ন উৎসব পালনসহ তাদের মাঝে উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। এপর্যন্ত প্রায় ২০০ শিশুকে ঈদসামগ্রী তুলে দিয়েছে তারা।

হাতেখড়ি ফ্রাইডে স্কুল
জেলে পরিবারের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনা মূল্যে পড়ানোর জন্য ‘হাতেখড়ি ফ্রাইডে স্কুল’ নামে একটি প্রজেক্ট চালু আছে। অর্ধশতাধিক শিশুকে এর আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি ৫ জন শিশুর প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার স্থায়ী দায়িত্ব নিয়েছে তারা।

প্রতিষ্ঠাতা বললেন
হাতেখড়ি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা রুবেল মিয়া বলেন, ‘হাতেখড়ির এ যাত্রা খুব একটা সুগম ছিল না। শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দুর্গম এলাকার জেলেশিশুর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে ফাউন্ডেশনটি। এর স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানজনক পুরস্কার ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড ২০২০’ লাভ করেছি। এ সম্মাননা আমাদের কাজের স্বীকৃতির পাশাপাশি উদ্যমকে আরও বেগবান করবে। অন্য সম্প্রদায়ের মতো এগিয়ে যাবে জেলে সম্প্রদায়ের শিশুরাও।’

jagonews24

জেলা প্রশাসকের বক্তব্য
হাতেখড়ি ফাউন্ডেশন সম্পর্কে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সংগঠনটি সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। জেলেপল্লির শিশুদের জন্য তারা যে ধরনের কাজ করছেন, তা অবশ্যই ভালো কাজ। তরুণ বয়সে তাদের এ ধরনের কাজকে সাধুবাদ জানাই। তাদের প্রয়োজনে আমরা সাথে আছি। এ সংগঠনের সাফল্য কামনা করছি।’

যে কথা না বললেই নয়
হাতেখড়ি ফাউন্ডেশনের সদস্য সংখ্যা ১৫০ জন। তারা প্রতিমাসে নিয়মিত ৩০ টাকা করে চাঁদা দিয়ে থাকেন। তাদের অর্থায়নেই সংগঠনের কাজগুলো সম্পন্ন হয়ে থাকে। তবে বিশেষ বিশেষ প্রজেক্টের সময় স্থানীয়রা সহায়তা করে থাকেন।

  • সর্বশেষ - ফিচার