ময়মনসিংহ, , ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

হাসপাতালের বেডে শুয়ে করোনা রোগীর আবেগঘন স্ট্যাটাস

  মিডিয়া ডেস্ক

  প্রকাশ : 

হাসপাতালের বেডে শুয়ে করোনা রোগীর আবেগঘন স্ট্যাটাস

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন সাংবাদিক হুমায়ুন কবির খোকন। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন তার স্ত্রী ও ছেলে। তারা বর্তমানে রাজধানীর উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।


প্রয়াত সাংবাদিক খোকনের স্ত্রী কবি শারমিন সুলতানা রিনা রোববার তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে করোনার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন।


স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-


‘গল্পটা এভাবেও শুরু হলে হয়তো ভালো হতো-


একটি রুমে দুটি বেড আর পাশাপাশি দুটি মানুষ গল্প ও খুনসুটিতে কেটে যেতে পারত আরও কিছু বর্ণিল সময়। আমাদের আরেকটি নতুন গল্পের সূচনা হতে পারত এখান থেকে; কিন্তু হলো না কিছুই। ভাগ্যের অজানা পরিহাসে সব উল্টেপাল্টে গেল একমুহূর্তে আমার বাঁচার উপাদান।


আমার হাজবেন্ড সাংবাদিক হুমায়ুন কবির খোকন; যাকে আমি সবসময় ‘সাংবাদিক’ বলে সম্বোধন করতাম। যে একাকী চলে গেছে নির্জন মাটির ঘরে। তার ঠিক দুদিন পর ছেলেকে নিয়ে এসে উঠেছি হাসপাতালে; পাশাপাশি দুটি সিটের কেবিনে। নিদারুণ শ্বাসকষ্ট নিয়ে আট দিন আইসিইউতে কাটানোর পর ফিরে এলাম জেনারেল বেডে। আমি ও আমার ছেলে আবীর দুই মা-বেটা একটা কেবিনে আছি।


পুরো বিশ্ব এখন কোভিড-১৯ করোনার মরণ ছোবলের কাছে হার মেনে যাচ্ছে। যুগে যুগে মানুষই সব বাধাবিপত্তি দূর করে অন্ধকার থেকে ছিনিয়ে এনেছে সোনালি আলোর বিকিরণ। মানুষ আবার জয়ী হবে, জয়ী তাকে হতেই হবে। জয় শব্দটা মানুষের আরেকটি প্রতিরূপ।


আমি যে হাসপাতালে আছি, সেটি উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতাল। দেশের একমাত্র প্রাইভেট করোনা হাসপাতাল এটি। আজীবনই আমার চোখে ঘুম কম। আমার খোকন সাহেব তার কাজ সেরে বাসায় আসতে রাত ২টা বা ৩টায় । আসলে আমরা খেয়ে-দেয়ে গল্প করতাম। চা খেতাম। গভীর রাতে আমাদের একসঙ্গে কখনও পাশাপাশি কখনও মুখোমুখি বসে চা পানের তুমুল নেশা ছিল দুজনেরই। রাতে আমাকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়। কিন্তু ঘুম আসে না। আগে জেগে থাকতাম সুখে; আর এখন একটা শূন্যতা ঘিরে ঘিরে থাকে, যার কোনো বর্ণনা হয় না। হয়তোবা এটিই আমার অযাচিত নিয়তি।


রাতে একের পর এক করোনা রোগী আসে। তরুণ ডাক্তার-নার্সগুলো তাদের অক্লান্ত সেবা দিয়ে যায়। সবার পরনে সাদা পিপি। তাদের দেখলে এক একজনকে মনে হয়— সফেদ দেবতা নেমে এসেছেন ধরায়; মর্ত্যবাসীদের উদ্ধারে। এখানে আসার পর রোগ সম্পর্কে আমার ভয় কেটে গেছে। কেটে গেছে হাসপাতাল সম্পর্কে অনীহা। এই রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতিটা সদস্যের আচরণে যে ভালোবাসা আর মুগ্ধতা পেলাম, তাদের এ অবদান কখনও ভুলব না।


এই হাসপাতালের যিনি চেয়ারম্যান– শাহেদ চৌধুরীর সঙ্গে আমার কথা হয়নি; তবে আমার প্রিয়জনের সঙ্গে নিয়মিত আমাদের চিকিৎসা নিয়ে যোগাযোগ করছেন। এখানকার ডাইরেক্টর মিজান ভাই আমাকে বোনের ভালোবাসায় আগলে রেখেছেন। সর্বক্ষণ আমার ও ছেলের খোঁজ নিচ্ছেন। আছেন গণসংযোগ কর্মকর্তা শিবলি ভাই। ডা. ওয়াহিদ, যিনি নিয়ম করে দেখে যাচ্ছেন প্রতিদিন।


আসলে বলতে চেয়েছিলাম ডাক্তারদের গল্প, কিন্তু শব্দেরাও হাত বাড়িয়ে আকাশ ছুঁতে চায়। চোখের সামনে দেখা এসব ডাক্তার-নার্স, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কী অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন; তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ডা. নুসরাত, ডা. মণি, ডা. ইমতিয়াজসহ আরও অনেকেই এখানে আছেন। আছেন নার্স, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং আনন্দ বিলিয়ে দিচ্ছেন রোগীদের মাঝে। তাদের এই ঋণ কি আসলে শোধ হবে?


ঢাকা শহরে বড় বড় হাসপাতালে করোনার কোনো চিকিৎসা হচ্ছে না। অথচ প্রতিদিন রোগী বাড়ছে। আর করোনা নিয়ে মানুষের মনেও রয়েছে প্রচুর ভয়। করোনা রোগীর তিন ফুটের দূরত্বে ভাইরাস আসতে পারে না। আর মানুষের মৃত্যুর পর তিন ঘণ্টায় ভাইরাসের কার্যক্রম নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং লাশের শরীর থেকে তিন ঘণ্টা পর ভাইরাস ধ্বংস হয়ে যায়।


করোনা আক্রান্ত রোগীর কোনো দোষ নয় এটা। এটা বিশ্বজুড়ে এক মহামারী। যে কোনো সময় যে কাউকে আঘাত করতে পারে। আবার প্রথম দিকে বুঝতে পারলে তা বাসার চিকিৎসাতেই ভালো হয়ে যায়। কিন্তু করোনা আক্রান্ত রোগীকে তাচ্ছিল্য করা হয় বলে এরা জনসম্মুখে মুখ খোলে না, ঘাতক ব্যাধিকে যন্ত্রণায় পোষে। সামাজিক লজ্জায় এরা আরও ছোট হতে থাকে, তখন তাদের মানসিক অবস্থার দ্রুত পতন ঘটে, যার পরিণাম মৃত্যু।


গতকালও দেখলাম এক উপসচিবের মৃত্যু। কিডনি জটিলতায়ও করোনা মনে করে তাকে কোনো হাসপাতালে ভর্তি করা হলো না। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করে মানবিক হতে হবে। আমরা শারীরিকভাবে একজন একজনের থেকে দূরে থাকব, এই দূরে থাকাটাই আমাদের আরও কাছে টানবে। আমরা ভুলে যাই সব ভেদাভেদ। এখন কেউ কাউকে দোষ দিয়ে পিছিয়ে পড়ে মৃত্যুর কোলে আর ঢলে না পড়ি।


সরকার, প্রশাসনসহ সবার কাজে সহযোগিতা করি। বিশ্বের এই লকডাউনের বিপদে আমরা সবাই সবার পাশে দাঁড়াই।


যেভাবে লিখতে চেয়েছিলাম সেভাবে পারিনি। অনুভূতি কেমন ভোঁতা হয়ে গেছে। আমার এ ঘোর বিপদে যারা আমার পাশে আছেন তাদেরকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না। তাদের সবার জন্য আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। সুস্থ হয়ে যেন বাসায় যেতে পারি— আপনারা আমার ও আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন।

  • সর্বশেষ - মিডিয়া